অশুভ প্রথা বা কুসংস্কারে বিশ্বাস (৩)

সফর মাসে সংঘটিত হওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা۞ প্রথম হিজরী সনের সফরুল মুযাফফর মাসে হযরত সায়্যিদুনা আলী মুরতাদা رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ এর সাথে খাতুনে জান্নাত হযরত সায়্যিদাতুনা ফাতেমাতুয যাহরা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهَا এর শাদী মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। (আল কামিলু ফিত তারীখ, ২/১২) ۞ সপ্তম হিজরী সনের সফরুল মুযাফফর মাসে মুসলমানদের হাতে খাইবার বিজয় হয়। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/৩৯২) ۞ سَيْفُ الله হযরত সায়্যিদুনা খালিদ বিন ওয়ালীদ, হযরত সায়্যিদুনা আমর বিন আস এবং হযরত সায়্যিদুনা ওসমান বিন তালহা আবদরীعَلَيْهِمُ الرِّضْوَان অষ্টম হিজরীর সফরুল মুযাফফর মাসে রাসূলূল্লাহ صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলাম কবুল করেন।(আল কামিলু ফিত তারীখ, ২/১০৯)۞ মাদায়িন (যেখানে কিসরার প্রাসাদ ছিলো) বিজয় হয় ষোড়শ হিজরীর সফরুল মুযাফফর মাসেই।করেন।(আল কামিলু ফিত তারীখ, ২/৩৫৭)এখনও কি আপনারা সফর মাসকে অলক্ষুণে বলে মনে করবেন? অবশ্যই না।
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد
——–লিখাটি আমীরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা “মুহাম্মদ ইলয়াস আত্তার” কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত ৯৪ পৃষ্ঠা সম্বলিত “অশুভ প্রথা” নামক রিসালার ৪০- নং পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই রিসালাটি অবশ্যই সংগ্রহে রাখুন। অন্যকে উপহার দিন। যারা মোবাইলে (পিডিএফ) রিসালাটি পড়তে চান তারা ফ্রি ডাউনলোড করুন ।ইসলামীক বাংলা বইয়ের লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুন
কুসংস্কার বিষয়ক লিখাটির প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব,মাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন

প্রশ্নোত্তর (বয়ান করা, ওয়াজ নসীহত করা ও মহিলাদের ব্যক্তিগত বিষয়ে)

আলেম নন এমন কারো পক্ষে বয়ান করা হারামপ্রশ্ন: কোন ইসলামী বোন যদি আলিমা না হয়ে থাকেন, তিনি কি ইসলামী বোনদের সুন্নাতে ভরা ইজতিমায় বয়ান করতে পারবেন?উত্তর: যিনি যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন না, তিনি যেন দ্বীনি বয়ান না দেন। কেননা, আমার আক্বা আ’লা হযরত رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ ফতোওয়ায়ে রযবীয়ার ২৩তম খন্ডের ৩৭৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন: ওয়াজ বলুন আর যে কোন ধরনের কথাবার্তাই বলুন- এতে সব চেয়ে প্রথম কথা হল আল্লাহ্ তাআলা ও তাঁর রাসুল صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم وَ عَزَّوَجَلّ এর অনুমতি। যে ব্যক্তি যথেষ্ট জ্ঞানের মালিক নন, তার পক্ষে ওয়াজ করা হারাম। সেই ব্যক্তির ওয়াজ শোনাও জায়েয নেই। কেউ যদি مَعَاذَ الله عَزَّوَجَل বদ-মাযহাবী হয়ে থাকে, তাহলে সে তো শয়তানেরই প্রতিনিধি। তার কথা শোনা তো জঘন্য ধরনের হারাম। (মসজিদে বয়ান দেবার ক্ষেত্রে তাকে বাধাঁ প্রদান করতে হবে)। আবার কারো বয়ান দ্বারা যদি ফিতনা সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে তাকেও ইমাম সাহেব সহ মসজিদের উপস্থিত লোকজন বাধাঁ দেবার হক রাখেন। আর যদি বিশুদ্ধ আকীদাসম্পন্ন পরিপূর্ণ সুন্নী আলেমে দ্বীন ওয়াজ করে থাকেন, তাহলে তাঁকে বাধাঁ দেবার অধিকার কেউ রাখে না। যেমন: মহান আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় পারার সূরা বাকারায় ১১৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন:
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن مَّنَعَ مَسَاجِدَ اللهِ أَن يُذْكَرَ فِيهَا اسْمُہٗ
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: কোন্ ব্যক্তি তার চেয়ে অধিক অত্যাচারী যে আল্লাহর মসজিদ সমূহে তাঁর নাম নেওয়ায় বাধাঁ প্রদান করে। (পারা: ২, সূরা: আল বাকারা, আয়াত: ১১৪) (ফতোওয়ায়ে রজবীয়া, ২৩তম খন্ড, ৩৭৮ পৃষ্ঠা)
আলিমের পরিচয়প্রশ্ন: তাহলে কি মুবাল্লিগ হবার জন্য দরসে নেজামী (অর্থাৎ আলিম কোর্স) সম্পন্ন করতে হবে?উত্তর: আলিম হবার জন্য যেমন দরসে নেজামী শর্ত নয়, তেমন কেবল সার্টিফিকেট থাকাও যথেষ্ট নয়; বরং জ্ঞান থাকাই বাঞ্ছনীয়। আমার আক্বা আ’লা হযরত رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বলেছেন: আলিমের পরিচয় এই যে, তাঁকে আক্বীদা সম্পর্কে পরিপূর্ণ রূপে ধারণা রাখতে হবে, অটল ও স্বাধীনচেতা হতে হবে এবং নিজের প্রয়োজনের বিষয়াদি অন্য কারো সাহায্য ব্যতিরেকে নিজে নিজে কিতাবাদি থেকে বের করার যোগ্যতা থাকতে হবে। কিতাবাদি অধ্যয়ন করে এবং আলিমদের নিকট শুনে শুনেও ইলম হাসিল করা যায়। (আহকামে শরীয়াত থেকে গৃহীত, ২য় খন্ড। ২৩১ পৃষ্ঠা) বুঝা গেল, আলিম হবার জন্য দরসে নেজামীর সার্টিফিকেট যেমন জরুরি ও যথেষ্ট নয়, তেমনি আরবি, ফার্সী ইত্যাদি জানাও শর্ত নয়; বরং জ্ঞান থাকা জরুরী।যথা, আমার আক্বা আ’লা হযরত رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বলেছেন: সার্টিফিকেট কোন বিষয়ই নয়। এমন অনেকই রয়েছে, যাদের সার্টিফিকেট আছে কিন্তু বিন্দুমাত্র ইলমে দ্বীন নেই। অথচ এমন অনেক রয়েছেন যাঁদের সার্টিফিকেট বলতেই নেই, কিন্তু অনেকে সার্টিফিকেটধারী তাঁদের ছাত্র হওয়ার যোগ্যতাও রাখে না। মোটকথা, ইলম (জ্ঞান) থাকাই জরুরী। (ফতোওয়ায়ে রযবীয়া, ২৩তম খন্ড, ৬৮৩ পৃষ্ঠা) اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ عَزَّوَجَلّ ফতোওয়ায়ে রযবীয়া শরীফ, বাহারে শরীয়াত, কানূনে শরীয়াত, নিসাবে শরীয়াত, মিরআতুল মানাজীহ্, ইলমুল কুরআন, তাফসীরে নঈমী, (অনুদিত) ইহ্ইয়াউল উলুম সহ এ ধরনের অসংখ্য উর্দু কিতাব রয়েছে যেগুলো অধ্যয়ন করে করে, বুঝে বুঝে, ওলামায়ে কেরামদের নিকট হতে জিজ্ঞাসা করে করেও যথা প্রয়োজন আক্বীদার মাস্আলাগুলো সম্পর্কে ইলম হাসিল করে ‘আলিম’ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করা যেতে পারে। আর যদি সেই সাথে ‘দরসে নেজামী’ কোর্স সম্পন্ন করার সুযোগও হয়ে যায় তা হলে তো সোনায় সোহাগা।
আলিম নন, এমন ব্যক্তির বয়ানের পদ্ধতিপ্রশ্ন: আলিম নন, এমন ব্যক্তির পক্ষেও বয়ান দেয়ার কোন পদ্ধতি আছে কি?উত্তর: আলিম নন, এমন ব্যক্তির পক্ষে বয়ান দেওয়ার সহজ উপায় হল, ওলামায়ে আহলে সুন্নাতের কিতাবাদি থেকে প্রয়োজন মত ফটোকপি করিয়ে নিয়ে সেগুলোর কাটিংগুলো নিজের ডায়েরীতে লাগিয়ে নিবেন এবং তা থেকে পড়ে পড়ে শুনাবেন। নিজ থেকে কিছুই বলবেন না। নিজের মতামত থেকে পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতের কিংবা হাদিস শরীফের কোন ব্যাখ্যা প্রদান করবেন না। কেননা, ‘তাফসীর বির রায়’** বা নিজের মন থেকে তাফসীর করা হারাম। নিজের অনুমান ও ধারণা করে কুরআনের আয়াত থেকে দলিল গ্রহণ করা কিংবা হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা করা গেলেও শরীয়াতে সেটির অনুমতি নেই। নবী করীম, রউফুর রহীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও কুরআন শরীফের তাফসীর বা ব্যাখ্যা করে সে যেন নিজের ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” (তিরমিযী, ৪র্থ খন্ড, ৪৩৯ পৃষ্ঠা, হাদিস: ২৯৫৯) আলিম নন, এমন ব্যক্তির বয়ানের ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিতে গিয়ে আমার আক্বায়ে নেয়ামত, আ’লা হযরত মুজাদ্দিদে দ্বীন ও মিলাত মাওলানা শাহ ইমাম আহমদ রযা খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বলেছেন: কেবল উর্দু জানা কোন জ্ঞানহীন লোক যদি নিজের পক্ষ থেকে কিছু না বলে বরং কোন আলিমের লেখা থেকে পড়ে শোনায় তাহলে তাতে কোন বাধাঁ নেই। (প্রকাশিত ফতোওয়ায়ে রযবীয়া, ২৩ খন্ড, ৪০৯ পৃষ্ঠা)(**সেই ব্যক্তিকেই ‘তাফসীর বির রায়’-কারী বলা হয়, যে পবিত্র কুরআনের তাফসীর করে নিজেরই জ্ঞান-বুদ্ধি, অনুমান ও ধারণা থেকে। যার সাথে নকলের বা শরীয়াত ভিত্তির প্রমাণাদির কোনই মিল থাকে না।)
মুবাল্লিগদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাপ্রশ্ন: দা’ওয়াতে ইসলামীর কতিপয় মুবাল্লিগ ও মুবাল্লিগা না পড়ে নিজের মুখ থেকেও বয়ান ইত্যাদি করে থাকেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে আপনার পক্ষ থেকে কি কোন নির্দেশনা পেতে পারি?উত্তর: তারা যদি আলিম হয়ে থাকেন, তা হলে তো কোন বাধাঁ অবশ্যই নেই। অন্যথায় আলিম নন, এমন মুবাল্লিগ কিংবা মুবাল্লিগাদের জন্য নির্দেশনা হচ্ছে, তাঁরা শুধু আলিমদের লেখাগুলো পড়ে পড়েই বয়ান করবেন। আলিম নন, এমন কাউকে যদি সুন্নাতে ভরা ইজতিমায় নিজের মুখ থেকে না পড়ে বয়ান করতে দেখে থাকেন, তা হলে দা’ওয়াতে ইসলামীর যিম্মাদারগণ তাঁকে বসিয়ে দিবেন। আলিম নন, এমন মুবাল্লিগ বা মুবাল্লিগা সহ যে কোন বক্তারই উচিত, তারা যেন দ্বীনি কোন বয়ান বা ভাষণ নিজের মুখ থেকে প্রদান না করেন। আমার আক্বা আ’লা হযরত মুজাদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত মাওলানা শাহ ইমাম আহমদ রযা খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বলেছেন: কেবল উর্দু জানা কোন জ্ঞানহীন লোক যদি নিজের পক্ষ থেকে কিছু না বলে বরং কোন আলিমের লেখা থেকে পড়ে শোনায় তা হলে তাতে কোন বাধাঁ নেই। তিনি আরো বলেছেন: কোন মুর্খ ব্যক্তি যদি নিজে থেকে কিছু বয়ান করার জন্য দাঁড়িয়ে যায়, তা হলে সেটিকে ওয়াজ বলা হারাম। সেই ওয়াজ শোনাও হারাম। আর মুসলমানদের এই অধিকার রয়েছে বরং দায়িত্বই হচ্ছে যে, তাকে মিম্বর থেকে নামিয়ে দিবেন। এই কাজটি হচ্ছে ‘নাহি আনিল মুনকার’ অর্থাৎ অসৎকাজে বাধাঁ প্রদান। আর এই ‘নাহি আনিল মুনকার’ করা ওয়াজিব। আল্লাহ্ তাআলাই ভাল জানেন। (ফতোওয়ায়ে রযবীয়া, ২৩তম খন্ড, ৪০৯ পৃষ্ঠা)
মহিলারা কি VCD-তে মুবাল্লিগদের বয়ান শুনতে পারবেন?প্রশ্ন: ইসলামী বোনেরা কি VCD বা মাদানী চ্যানেলে না-মুহরিম মুবাল্লিগের বয়ান শুনতে পারবেন? এ কাজটি কি বেহায়াপনা হিসাবে গণ্য হবে না?উত্তর: বেহায়াপনা এক বিষয়, আর VCD তে না-মুহরিমদের বয়ান দেখা ও শোনা অন্য বিষয়। ইসলামী বোনদের জন্য পর্দার প্রতি যত্নবান থাকা সহ কতিপয় শরীয়াত ভিত্তিক পাবন্দি বজায় রাখার পাশাপাশি না-মুহরিম পুরুষদের দেখার ব্যাপারে কিছু শৈথিল্য অবশ্য রয়েছে। মাকতাবাতুল মদীনা কর্তৃক প্রকাশিত বাহারে শরীয়াতের ১৬তম খন্ডের ৮৬ পৃষ্ঠায় ফতোওয়ায়ে আলমগিরীর বরাত দিয়ে উল্লেখ রয়েছে: কোন মহিলা কর্তৃক না-মুহরিম কোন পুরুষের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার হুকুম এটাই যা পুরুষ পুরুষের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার হুকুম রয়েছে। এই বিষয়টি তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন মহিলা দৃঢ়তার সাথে মনে করবে যে, ঐ লোকটির প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার কারণে কামভাব সৃষ্টি হবে না। পক্ষান্তরে কামভাবের সন্দেহ থাকলে কখনো দৃষ্টি দিতে পারবে না। (আলমগিরী, ৫ম খন্ড, ৩২৭ পৃষ্ঠা) হ্যাঁ, আল্লাহ্ না করুন, বয়ানের VCD কিংবা মাদানী চ্যানেল দেখার সময়ও যদি গুনাহের দিকে ঝুকে পড়ে, তাহলে তাওবা ও ইস্তিগফার করে যত দ্রুত সম্ভব সেখান থেকে সরে যাবেন। আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ হচ্ছে, যুবক-বৃদ্ধ উভয় ধরনের ব্যক্তিকে দেখা যথাসম্ভব পরিহার করে চলবেন। কেননা, বড়ই নাজুক যুগ চলছে। তবে, বয়োবৃদ্ধ আলিম কিংবা অনাকর্ষণীয় বৃদ্ধ অথবা আধ-বয়সী পীর ও মুর্শিদকে (যদি কাছে কোন না-মুহরিম না থাকে) দেখাতে কোন বাধাঁ নেই। এতে ফিতনার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। তা সত্ত্বেও যদি দৃষ্টি দান কালে শয়তান কোন রূপ আকর্ষণ সৃষ্টি করে দেয়, তা হলে তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নিবেন আর সেখান থেকে চলে যাবেন।
মহিলারা কি না’ত-পড়ুয়াদের VCD দেখতে পারবেন?প্রশ্ন: মাদানী চ্যানেল কিংবা VCD তে ইসলামী বোনেরা কি যুবক না’ত-পড়ুয়াদেরকেও দেখতে এবং শুনতে পারবেন?উত্তর: না’ত-পড়ুয়া ব্যক্তি তিনিও তো একজন যুবক পুরুষ। তদুপরি হাত ইত্যাদি নড়াছড়া করার বিশেষ ভঙ্গিও রয়েছে। তাছাড়া আবৃত্তির সুর ও টোনের মধ্যে এমনিতেই তো এক ধরনের যাদু থাকে। এসব কিছু যেখানে বিদ্যমান, সেখানে কোন ‘মহিলা ওলী’ও কি এ ধরনের যুবক না’ত-পড়ুয়া দেখে নিজেকে গুনাহ থেকে বাঁচাতে পারবেন! দেখা তো দূরের কথা মাদানী ইসলামী বোনদেরকে তো আমি এই পরামর্শই দিব যে, তারা যেন কোন যুবকের অডিও ক্যাসেটও না শোনেন। কেননা, তার চমৎকার আওয়াজে মহিলাটি ফিতনায় নিপতিত হয়ে যেতে পারেন। সহীহ্ বোখারী শরীফে রয়েছে: ছরকারে মদীনা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর এক জন ‘হুদী-পড়ুয়া’ (উটকে দ্রুত হাঁকাবার উদ্দেশ্যে বিভোর করে তোলা শের পাঠক) ছিলেন। তিনি হচ্ছেন হযরত আনজাশাহ্ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ তাঁর অত্যন্ত মোহনীয় কন্ঠস্বর ছিল। (কোন সফরে মহিলারাও সাথে ছিলেন। এদিকে সায়্যিদুনা আনজাশাহ্ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ শের পাঠ করছিলেন)। ছরকারে মদীনা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم তাঁকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেন: “হে আনজাশাহ্! আস্তে; নাজুক কাঁচগুলো ভেঙ্গে দিও না”। (বোখারী, ৪র্থ খন্ড, ১৫৮ পৃষ্ঠা, হাদীস: ৬২১১)
হাকীমুল উম্মত হযরত মুফতী আহমদ ইয়ার খান উক্ত হাদীস শরীফটির টীকায় লিখেছেন: “অর্থাৎ এই সফরে আমার সাথে মহিলারাও রয়েছে। যাদের হৃদয় নাজুক কাঁচের মতই কোমল। মোহনীয় কণ্ঠ তাদের হৃদয়ে তাড়াতাড়ি প্রভাব সৃষ্টি করে। আর তারা লোকদের গানের কারণে গুনাহের দিকে ধাবিত হতে পারে। তাই তোমার গান বন্ধ করে দাও।” (মিরআত, ৬ষ্ঠ খন্ড, ৪৪৩ পৃষ্ঠা) অবশ্য মৃত কোন নাত- পড়ুয়ার অডিও ক্যাসেটে তেমন কোন আশঙ্কা নেই। তা সত্ত্বেও শয়তান যদি মনের ভাবকে ‘গুনাহে’র দিকে ঘুরিয়ে দেয়, তাহলে তাওবা ও ইস্তেগফার করতঃ তৎক্ষণাৎ টেপ রেকর্ডারটি বন্ধ করে দিবেন।
হায়জ ও নেফাস সম্পর্কে আটটি মাদানী ফুল﴾১﴿ ইসলামী বোনেরা হায়জ ও নেফাস কালে দরসও দিতে পারবেন, বয়ানও করতে পারবেন। ইসলামী কিতাব স্পর্শ করাতেও কোন বাধাঁ নেই। তবে কুরআন শরীফে হাত, আঙ্গুলের মাথা কিংবা শরীরের কোন অংশ লাগানো নিষেধ ও হারাম। তাছাড়া কোন কাগজে বা চিরকুটে যদি কুরআন শরীফের আয়াত লিখিত থাকে এবং অন্য কিছু লেখাও পাশাপাশি না থাকে, তা হলে সেই ধরণের কাগজের সামনে-পিছনে কোণায় বা কোন অংশেই স্পর্শ করার অনুমতি নেই।
﴾২﴿ হায়েজ ও নেফাস অবস্থায় পবিত্র কুরআন কিংবা পবিত্র কুরআনের কোন আয়াত পাঠ করা ও স্পর্শ করা উভয়টি হারাম। পবিত্র কুরআনের বাংলা, ইংরেজী, ফার্সী, উর্দু কিংবা যে কোন ভাষায় অনুদিত অংশ পাঠ করা ও স্পর্শ করাও স্বয়ং কুরআন পাঠ করা ও স্পর্শ করারই সমতুল্য। (বাহারে শরীয়াত, ২য় খন্ড, ৪৯, ১০১ পৃষ্ঠা)
﴾৩﴿ কুরআন শরীফ যদি জুযদানে মোড়ানো থাকে, তাহলে সেই জুযদান স্পর্শ করাতে কোন বাধাঁ নেই। অনুরূপ রুমাল ইত্যাদি এমন যে কোন কাপড় দিয়ে স্পর্শ করাতেও কোন বাধাঁ নেই, যা নিজের পরিধানেরও নয়, কুরআন শরীফটিরও নয়। জামার আস্তিন দিয়ে, ওড়নার আঁচল দিয়ে এমনকি কোন চাদরের এক প্রান্ত যদি (কাঁধের) উপর থাকে, সেক্ষেত্রে অপর প্রান্ত দিয়ে স্পর্শ করা হারাম। কেননা, এগুলো ব্যক্তিটির পরিধানের বস্ত্র হিসাবেই গণ্য। (বাহারে শরীয়াত, ২য় খন্ড, ৪৮ পৃষ্ঠা)
﴾৪﴿ কেউ যদি দোআর নিয়্যতে কিংবা বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে কুরআন শরীফ পাঠ করে যেমন, ‘ بِسۡمِ اللہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ , শোকরিয়া আদায়ের নিয়্যতে অথবা হাঁছির পরে ‘اَلۡحَمۡدُ لِلہِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ’ বলে, বা কোন মুসিবতের সংবাদ শুনে ‘اِنَّ لِلّٰهِ واِنَّ اِلَيْهِ رَاجِعُوْن’ বলে, আল্লাহর প্রশংসার নিয়্যতে সম্পূর্ণ সূরা ফাতিহা কিংবা আয়াতুল কুরছী পাঠ করে অথবা সূরা হাশরের শেষের তিনটি আয়াত ‘هُوَ اللهُ الَّذِيْ لَآ اِلٰهَ اِلَّا هُو’ থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করে, সেক্ষেত্রে কুরআন শরীফ পাঠ করার নিয়্যত না থাকা সাপেক্ষে কোন বাধাঁ নেই। এমনি রূপে ‘ক্বুল’ শব্দটি বাদ দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করার উদ্দেশ্যে তিনটি ‘ক্বুল’ই পাঠ করা যাবে। তবে ‘ক্বুল’ শব্দ ব্যবহার করে পাঠ করা যাবে না। যদিও তা আল্লাহর প্রশংসার উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। তখন সেটি কুরআন পাঠ হিসাবেই গণ্য হয়ে যাবে। সেখানে নিয়্যতের দোহাই দেওয়ার কোন সুযোগ থাকবে না। (বাহারে শরীয়াত, ২য় খন্ড, ৪৮ পৃষ্ঠা, মাকতাবাতুল মদীনা, বাবুল মদীনা, করাচী)
﴾৫﴿ কুরআন শরীফ ব্যতীত যে কোন জিকির-আজকার, দরূদ-সালাম, নাত নাত শরীফ পাঠ করা, আজানের জবাব দেওয়া ইত্যাদিতে কোনই বাধাঁ নেই। জিকিরের হালকাতেও যোগদান করতে পারবেন। বরং জিকির করাতেও পারবেন। কিন্তু এসব কিছু অযু সহকারে কিংবা অন্ততঃ কুলি করে হলেও পাঠ করা উত্তম। অযু বা কুলি না করে পড়াতেও কোন অসুবিধা নেই।
﴾৬﴿ এই কথাটি বিশেষ করে মনে রাখবেন যে, (হায়জ ও নেফাসের সময়কালে) নামাজ ও রোজা উভয়ই হারাম। (বাহারে শরীয়াত, ২য় খন্ড, ১০২ পৃষ্ঠা, আলমগিরী, ১ম খন্ড, ৩৮ পৃষ্ঠা)
﴾৭﴿ ভদ্রতা রক্ষার খাতিরে হলেও এমন অবস্থায় কখনো নামাজ পড়বেন না। কেননা, ফুকাহায়ে কেরাম رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِمْ এমন পর্যন্ত বলেছেন যে: জেনে বুঝে শরীয়াত সম্মত কোন ওজর ব্যতিরেকে অযু না থাকা অবস্থায় নামাজ পড়া কুফরী, যদি সেটিকে জায়েয বলে মনে করে কিংবা ঠাট্টা মূলক ভাবে করে। (মিনাহুর রওজ লিল কারী, ৪৬৮ পৃষ্ঠা, দারুল বাশায়িরিল ইসলামিয়্যাহ্, বৈরুত)
﴾৮﴿ হায়জ ও নেফাসের সময়কালের নামাজগুলোর কাজা দিতে হবে না। অবশ্য পবিত্র রমজানের রোজাগুলোর কাজা দেওয়া ফরজ। (বাহারে শরীয়ত, ২য় খন্ড, ১০২ পৃষ্ঠা, দুররে মুখতার, ১ম খন্ড, ৫৩২ পৃষ্ঠা) যত দিন পর্যন্ত কাজা রোজা নিজের যিম্মায় বাকি থাকবে, তত দিন পর্যন্ত নফল রোজা কবুল হওয়ার আশা করা যাবে না। এই বিধানটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য মাকতাবাতুল মদীনা কর্তৃক প্রকাশিত বাহারে শরীয়াত, দ্বিতীয় খন্ডের ৯১ থেকে ১০৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত অধ্যয়ন করার জন্য সকল ইসলামী বোনদের প্রতি কেবল আবেদনই করা হচ্ছে না বরং কঠোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد تُوْبُوْا اِلَى الله! اَسْتَغْفِرُ اللهصَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّدপর্দা বিষয়ে গুরুত্বপুর্ণ মাদানী ফুলখালাত ভাই, মামাত ভাই, ফুফাত ভাই, চাচাত ভাই, জেঠাত ভাই, তালত ভাই, দেবর, ভাসুর, খালু, ফুফা, ভগ্নিপতি বরং নিজের না-মুহরিম পীর ও মুর্শিদদের থেকেও পর্দা করে চলবেন। অনুরূপ পুরুষদের জন্যও মামী, চাচী, জেঠী, ভাবী ও শালী জাতীয় সম্পর্কের মহিলাদের থেকে পর্দা করতে হবে। মুখে ডাকা ভাই ও বোন, মুখে ডাকা মা ও পুত্র আর মুখে ডাকা পিতা ও কন্যাদের জন্যও পর্দা করতে হবে। এমনকি পালক পুত্রের (নারী-পুরুষদের যৌন বিষয়াদির জ্ঞান সৃষ্টি হলে) বেলায়ও পর্দা করতে হবে। অবশ্য দুধের সাথে সম্পর্ক রয়েছে এমন কারো সাথে পর্দা করতে হবে না। যেমন: দুধ পান করিয়েছে এমন মাতা ও সেই পুত্রের এবং দুগ্ধ পান জনিত ভাই-বোনদের মাঝে পর্দা করতে হবে না। অতএব, পালিত পুত্র ও পালিত কন্যা ইত্যাদিকে হিজরী বৎসর অনুযায়ী দুই বৎসর বয়সের মধ্যে মহিলারা নিজের কিংবা সহোদর বোনের কিংবা নিজ কন্যার কিংবা নিজের আপন ভাগিনীর দুধ এক বার হলেও পান করিয়ে দিবেন। এমন ভাবে পান করাবেন যেন দুধ শিশুটির কণ্ঠনালী অতিক্রম করে নিচে চলে যায়। এভাবে যাদের সাথে দুধের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল, তাদের সাথে পর্দা করা আর ওয়াজিব রইল না। আলা হযরত رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বলেছেন: আর ভরা যৌবন কালে কিংবা ফিতনার ভয় থাকলে পর্দা করাই উচিত । কেননা, সাধারণ লোকদের মনে এই দুধের সম্পর্কটির গুরুত্ব তেমন নেই বললেই চলে। (ফতোওয়ায়ে রযবীয়া থেকে গৃহীত, ২২ তম খন্ড, ২৩৫ পৃষ্ঠা, রযা ফাউন্ডেশন, মারকাযুল আউলিয়া, লাহোর) মনে রাখবেন! হিজরী সন অনুযায়ী দুই বৎসরের পর কোন (পুরুষ বা মেয়ে) শিশুকে দুধ পান করানো হারাম। তবু কেউ যদি আড়াই বৎসরের মধ্যে দুধ পান করিয়ে থাকে, তা হলেও দুধের সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য বাহারে শরীয়াত, ৭ম খন্ড থেকে ‘দুধের সম্পর্কের’ শীর্ষক বয়ান পাঠ করতে পারেন। তাছাড়া (৩২ পৃষ্ঠার) ‘আহত সাপ’ নামক রিসালাটি অবশ্যই পাঠ করে নিবেন। গৃহবাসী সকল সদস্যদের প্রতি আমার মাদানী সালাম জানিয়ে আমি গুনাহ্গারদের সর্দারের জন্য মদীনার, জান্নাতুল বাক্বীর ও বিনা হিসাব মাগফিরাতের মাদানী অনুরোধ করবেন। একই দোআয় আল্লাহ তাআলা আপনাকেও সর্বদা শামিল করুন।اَلسَّلَامُ مَعَ الْاِكْرَام (রিসালার লিখক)৮টি মাদানী কাজ (ইসলামী বোনদের জন্য)-মারকাযে মজলিসে শূরার পক্ষ থেকে-
﴾১﴿ ইনফিরাদী কৌশিশ।
﴾২﴿ ঘর দরস।
﴾৩﴿ ক্যাসেট বয়ান।
﴾৪﴿ মাদরাসাতুল মদীনা (বয়ষ্কা মহিলাদের)।
﴾৫﴿ সুন্নাতে ভরা সাপ্তাহিক ইজতিমা।
﴾৬﴿ নেকীর দাওয়াতের উদ্দেশ্যে এলাকায়ী দাওরা। ﴾
৭﴿ সাপ্তাহিক তারবিয়াতী হালকা। ﴾
৮﴿ মাদানী ইন্আমাত।
﴾১﴿ ইনফিরাদী কৌশিশ: নতুন নতুন ইসলামী বোনদের প্রতি ইনফিরাদী কৌশিশ করার মাধ্যমে মাদানী মাহলের সাথে তাদের সম্পৃক্ত করিয়ে নিবেন। তাদেরকে মুয়াল্লিমা, মুবাল্লিগা ও মুদাররিসা বানিয়ে দা’ওয়াতে ইসলামীর মাদানী কাজের পরিধি বিস্তৃত করুন। যেসব ইসলামী বোনেরা প্রথমে আসতেন, বর্তমানে আসেন না বিশেষ করে তাঁদেরকে ইনফিরাদী কৌশিশ করে পুনরায় মাদানী মাহলের সাথে সম্পৃক্ত করিয়ে নিবেন। শায়খে তরিকত, আমীরে আহলে সুন্নাত, দা’ওয়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা, হযরত আল্লামা মাওলানা আবু বিলাল মুহাম্মদ ইলিয়াস আত্তার কাদেরী রযবী যিয়ায়ী বলেছেন: দা’ওয়াতে ইসলামীর শতকরা ৯৯% কাজ ইনফিরাদী কৌশিশের মাধ্যমেই সম্ভব।
﴾২﴿ ঘর দরস: ঘরের মধ্যে মাদানী মাহল তৈরি করার জন্য দৈনিক কম করে হলেও এক বার ফয়যানে সুন্নাত থেকে দরস দেবার বা শোনার ব্যবস্থা করবেন। (এতে কোন না-মুহরিম যেন না থাকে)। আমীরে আহলে সুন্নাত কর্তৃক প্রকাশিত কিতাবাদি থেকেও স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী দরস দেওয়া যেতে পারে। (প্রতিদিন সময়কাল ৭ মিনিট) (ফয়যানে সুন্নাতের দরসের পদ্ধতি ফয়যানে সুন্নাত কিতাবের প্রথম থেকে দেখে নিবেন)।
(৩﴿ ক্যাসেট বয়ান: সকল ইসলামী বোনেরা প্রতি দিন ইনফিরাদী ভাবে অথবা সকল গৃহবাসীদের সাথে নিয়ে (না-মুহরিম যেন না থাকে) শায়খে তরিকত, আমীরে আহলে সুন্নাত এর সুন্নাতে ভরা বয়ানসমূহ সহ মাদানী মুযাকারা সমূহ এবং ‘মাকতাবাতুল মদীনা’ কর্তৃক প্রচারিত অপরাপর মুবাল্লিগদের সুন্নাতে ভরা বয়ানসমূহ অবশ্যই শুনবেন।সাপ্তাহিক সুন্নাতে ভরা ইজতিমা ও তারবিয়াতী হালকাগুলোতে প্রতি মাসে, (মহিলা প্রাপ্ত বয়ষ্কা) মাদরাসাতুল মদীনায় প্রতি সপ্তাহে এবং জামেয়াতুল মদীনায় দৈনিক ভাবে ‘ক্যাসেট ইজতিমা’ করবেন। (সুন্নাতে ভরা বয়ান কিংবা মাদানী মুযাকারা সমূহ কেবল একটি মাত্র ক্যাসেটও যারা প্রতিদিন শুনে থাকেন, তাঁদের কথা ভেবে আমার মন আনন্দিত হয়ে যায়)।
﴾৪﴿ মাদরাসাতুল মদীনা (প্রাপ্ত বয়স্কা ইসলামী বোন): প্রত্যেক যাইলী হালকায় অন্ততঃ একটি করে হলেও (প্রাপ্ত বয়স্কা ইসলামী বোন) মাদরাসাতুল মদীনার ব্যবস্থা করবেন। মাদরাসাতুল মদীনায় মহিলা শিক্ষার্থীনিদের হাদফ কমপক্ষে ১২ জন। (সময় সীমা সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা ১২ মিনিট)। সকাল ৮:০০ ঘটিকা থেকে আসরের আজানের পূর্ব পর্যন্ত যে কোন সময়ে (পর্দাওয়ালা স্থানে) ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশুদ্ধ কুরআন শরীফ পাঠ শিখানোর পাশাপাশি গোসল, অযু, নামাজ, সুন্নাত, দোআ সহ মহিলাদের শরয়ী মাস্আলা মাসায়িল ইত্যাদি মৌখিক ভাবে নয়, বরং মাকতাবাতুল মদীনা কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইসলামী বোনদের নামাজ’, ‘জান্নাতী জেওর’, নামাজের আহকামসমূহ’ ইত্যাদি কিতাবাদি থেকে দেখে দেখে শিখাবেন। মাদরাসাতুল মদীনা (প্রাপ্ত বয়স্কা ইসলামী বোনদের) ‘মাদানী ফুল’ মোতাবেক প্রতিষ্ঠা করবেন।
﴾৫﴿ সাপ্তাহিক সুন্নাতে ভরা ইজতিমা: ইসলামী ভাইদের ‘শহর মজলিসে মুশাওয়ারাত’-এর অনুমতি সাপেক্ষে সপ্তাহের যে কোন দিন নির্ধারণ করে যাইলী হালকা, হালকা, এলাকা কিংবা শহর ভিত্তিক পর্দাওয়ালা স্থানে সাপ্তাহিক সুন্নাতে ভরা ইজতিমা করবেন। দিন ও সময় নির্ধারিত করে রাখবেন। অংশগ্রহণকারীদের হাদফ কমপক্ষে ১২ জন: প্রতিটি যাইলী হালকায় থাকবেন কমপক্ষে ১২ জন। (সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টার এই) সাপ্তাহিক সুন্নাতে ভরা ইজতিমাটি ‘মাদানী ফুল’(অর্থাৎ মারকাযী মজলিসে শূরা (দা’ওয়াতে ইসলামী)র পক্ষ থেকে প্রদত্ত নীতিমালা।) মোতাবেকই করবেন। ইসলামী বোনদের পক্ষে মাইক, ম্যাগাফোন, সিডি প্লেয়ার ও ইকোসাউন্ড ইত্যাদি ব্যবহার করার অনুমতি নেই।
﴾৬﴿ নেকীর দাওয়াতের উদ্দেশ্যে এলাকায়ী দাওরা: সপ্তাহের যে কোন দিন পূর্ব থেকে নির্ধারণ করতঃ আজ এই স্থানে কাল ঐ স্থানে করে ‘নেকীর দাওয়াতের এলাকায়ী দাওরা’র সৌভাগ্য অর্জন করবেন। অন্ততঃ পক্ষে ৭ জন ইসলামী বোন (যাদের মাঝে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ অবশ্যই থাকবেন) নিজের যাইলী হালকা কিংবা হালকার এলাকায় (পর্দার প্রতি যত্নবান থেকে) ঘরে ঘরে গিয়ে ৩০ মিনিট ‘নেকীর দাওয়াতের এলাকায়ী দাওরা’ করার ব্যবস্থা করবেন। এর পর পূর্ব নির্ধারিত স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে মাদানী মারকায কর্তৃক প্রদত্ত কর্মপদ্ধতি মোতাবেক এলাকায়ী দাওরার ইজতিমার ব্যবস্থা করবেন। (সময় কাল ৬৩ মিনিট)। সকল ইসলামী বোনেরা নিজেদের সকল ধরনের মাদানী কাজকর্ম থেকে অবসর হয়ে মাগরিবের আজানের আগে আগেই ঘরে পৌঁছে যাবেন।
﴾৭﴿ সাপ্তাহিক তারবিয়াতী হালকা: ইসলামী ভাইদের ‘শহর মজলিশে মুশাওয়ারাতে’র অনুমতি সাপেক্ষে সপ্তাহের যে কোন দিন পূর্ব থেকে নির্ধারণ করতঃ হালকা, এলাকা কিংবা শহর ভিত্তিক তারবিয়াতী হালকার ব্যবস্থা করবেন। (সর্বোচ্চ সময়কাল হবে ২ ঘণ্টা)। তারবিয়াতী হালকার জন্য পর্দাওয়ালা স্থান, দিন ও সময় পূর্ব থেকে নির্ধারণ করে রাখবেন। মাদানী মারকায কর্তৃক প্রদত্ত কর্মপদ্ধতি মোতাবেক গোসল, অযু, নামাজ, সুন্নাত, দোআ, মহিলাদের শরয়ী মাস্আলা-মাসায়িল, দরস ও বয়ানের পদ্ধতি এবং দা’ওয়াতে ইসলামীর পরিভাষাগুলো সহ বিশুদ্ধ উচ্চারণ শিক্ষা দিবেন। তাছাড়া শাজরায়ে আত্তারিয়ার ওয়াজিফা সমূহ মুখস্থ করাবেন। আর ইনফিরাদী কৌশিশের মাধ্যমে অধিক হারে মাদানী কাজ করার মন-মানসিকতা সৃষ্টি করে দিবেন। ৮টি মাদানী কাজের কথা বুঝিয়ে দেওয়ার পর মার্জিত ও গ্রহণযোগ্য উপায়ে কোন দায়িত্ব সোপর্দ করবেন। তাছাড়া আমীরে আহলে সুন্নাত دَامَتْ بَرَكَاتُهُمُ العَالِيَه মারকাযী মজলিসে শূরার পক্ষ থেকে প্রচারিত ‘মাদানী ফুল’ মোতাবেক ইসলামী বোনদের তারবিয়াত করবেন। প্রতিটি যাইলী হালকায় যোগদানকারীনি ইসলামী বোনের হাদফ কমপক্ষে ৭ জন।
﴾৮﴿ মাদানী ইনআমাত: আমীরে আহলে সুন্নাত دَامَتْ بَرَكَاتُهُمُ العَالِيَه কর্তৃক প্রদত্ত ৬৩টি মাদানী ইন্আমাত নেককার হওয়ার সেরা উপায় হিসাবে সাব্যস্ত। অতএব, পূর্ব থেকে সময় নির্ধারণ করতঃ প্রতি দিনই ফিকরে মদীনা করবেন। (অর্থাৎ ভেবে দেখবেন যে, মাদানী ইন্আমাত অনুযায়ী আজকের দিনে কতটুকু আমল করা হল)। রিসালায় প্রদত্ত খালি ঘর পূরণ করে প্রতি মাদানী মাসের প্রথম দশ দিনের মধ্যে আপনার এলাকার যিম্মাদার ইসলামী বোনের নিকট জমা করিয়ে দিবেন। তাছাড়া মাকতাবাতুল মদীনা কর্তৃক প্রকাশিত ‘মাদানী তোহফা’র মাধ্যমে অপরাপর ইসলামী বোনদেরকেও ‘মাদানী ইন্আমাত’ অনুযায়ী আমল করার তারগীব দিবেন। ইসলামী বোনদের প্রত্যেকেই এই প্রচেষ্টায় থাকবেন তিনি যেন আত্তারের আজমিরী, বাগদাদী, মক্কী ও মাদানী কন্যা হিসাবে তৈরি হবার মর্যাদা লাভ করতে পারেন(এর বিস্তারিত মাদানী ইন্আমাত রিসালায় দেখুন।) ইনফিরাদী কৌশিশকারী ইসলামী বোনেরা ‘মাদানী ইন্আমাত’ অনুযায়ী আমল করতঃ প্রতি মাসে মাদানী ইনআমাতের অন্ততঃ ২৬টি রিসালা বন্টন করে পরের মাসে সেগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করবেন। প্রতি যাইলী হালকার হাদফ হচ্ছে কমপক্ষে ১২টি রিসালা।
বিশেষ তাকিদ: যে কোন ধরনের বয়ান করবেন ‘মাদানী ফুল’ মোতাবেক ডায়েরী থেকে পাঠ করে করেই। মুখে বলার কখনো অনুমতি নেই।
জাহাজের মুসাফিরহযরত সায়্যিদুনা নোমান বিন বশীর رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ হতে বর্ণিত, রাসূলগণের সর্দার, দোআলমের ছরওয়ার মালিক ও মোখতার, হুযুর নবী করীমصَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: “আল্লাহ্ তাআলার বিধি-বিধান ও আদেশ-নিষেধে যারা অলস ও উদাসীন আর যারা তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে তাদের দৃষ্টান্ত সেসব লোকের ন্যায় যারা জাহাজে লটারী নিল। কেউ পেল নিচের অংশ, কেউ পেল উপরের। নিচের অংশের লোকদের পানির জন্য উপরের অংশের লোকদের নিকট যেতে হত। তাই তারা এটিকে শুধুশুধু দুর্ভোগ মনে করে একটি কুঠার নিয়ে কেউ জাহাজের নিচের অংশে একটি ছিদ্র করতে লাগল। উপরের অংশের লোকজন তার নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল: তোমার কী হয়ে গেল? সে বলল: আমার কারণে তোমাদের কষ্ট হত, আমার পানি ছাড়া তো আর চলে না। এবার তারা যদি তার হাত ধরে ফেলে তা হলেই তাকে বাঁচাল, আর নিজেরাও বাঁচবে। যদি তাকে সেই অবস্থায় এড়িয়ে চলে তা হলে তাকে ধ্বংস করল এবং নিজেদের জীবনও ধ্বংস করবে।” [সহীহ বোখারী। খন্ড: ২। পৃষ্ঠা : ২০৮। হাদিস : ২৬৮৬]
গুনাহের ভয়াবহতা অন্যদেরকেও ঘিরে ফেলেউক্ত হাদীসটির টীকায় মিরআতুল মানাজীহ্ কিতাবে উল্লেখ রয়েছে: হাদীসটিতে একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে অসৎকাজে বাধাঁ দেওয়ার এবং সৎকাজে আদেশ দেওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আরও বলা হয়েছে: اَمْرٌ بِالْمَعْرُوْفْ وَنَهْىٌ عَنِ الْمُنْكَر অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে বারণ করার মত গুরু দায়িত্বটিকে যদি এই মনে করে এড়িয়ে চলা হয় যে, অসৎকর্মশীলরা নিজেরাই ক্ষতির শিকার হবে, তাতে আমাদের কী আসে যায়, এই চিন্তা ভুল। এ কারণে যে, তার গুনাহের প্রভাব গোটা সমাজকে ঘিরে নিজ আশ্রয়ে নিয়ে নেয়, আর যদ্রূপ নৌকা ছিদ্রকারী লোকটি নিজেই ধ্বংসের শিকার হত না বরং সকল যাত্রীকেই ডুবাত তদ্রূপ অসৎকর্মশীল কিছু লোকের এই অপরাধ গোটা সমাজেই সংক্রমিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। [মিরআতুল মানাজীহ্। খন্ড: ৬। পৃষ্ঠা : ৫০৪]
গুনাহের পাঁচটি পার্থিব ক্ষতিগুনাহের পার্থিব ক্ষতির বর্ণনা পেশ করতে গিয়ে দাওয়াতে ইসলামীর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মাকতাবাতুল মদীনা কর্তৃক প্রকাশিত ১৪৮ পৃষ্ঠা সম্বলিত ‘নেকীর প্রতিদান ও গুনাহের সাজা’ কিতাবের ৫১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে: হুজুর নবিয়ে পাক, ছাহিবে লাওলাক, সাইয়াহে আফলাক صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: “হে লোক সকল! পাঁচটি বিষয় থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তোমরা পাঁচটি বিষয় থেকে বিরত থাকিও।(১) যে জাতি ওজনে কম দেয়, আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে উর্ধ্বমূল্য ও শস্যস্বল্পতায় ফেলেন। (২) যে জাতি ওয়াদা খেলাফ করে, আল্লাহ্ তাআলা তাদের দুশমনদের তাদের উপর শাসক হিসাবে নিয়োজিত করে দেন। (৩) যে জাতি যাকাত আদায় করে না, আল্লাহ্ তাআলা তাদের উপর থেকে বৃষ্টির পানি রুখে থাকেন। চতুষ্পদ জন্তুরা যদি না থাকত, তাহলে তাদের ভাগ্যে এক ফোঁটা পানিও জুটত না। (৪) যে জাতির মধ্যে অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা বিস্তার পাবে, আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে প্লেগ রোগে আক্রান্ত করিয়ে থাকেন। (৫) যে জাতি কুরআন অনুসরণ না করে বিচার করে, আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে সীমালঙ্ঘন (অর্থাৎ ভূল বিচার) করার স্বাদ ভোগ করিয়ে থাকেন, আর তাদের এককে অন্যের আতঙ্কে রাখেন।” [কুররাতুল উয়ূন। পৃষ্ঠা : ৩৯৬]
এই রিসালার বাকি লিখা এখানে——–লিখাটি আমীরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা “মুহাম্মদ ইলয়াস আত্তার” কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত ৩২ পৃষ্ঠা সম্বলিত “কারবালার রক্তিম দৃশ্য” নামক রিসালার ১৫-৩১ নং পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই রিসালাটি অবশ্যই সংগ্রহে রাখুন। অন্যকে উপহার দিন। যারা মোবাইলে (পিডিএফ) রিসালাটি পড়তে চান তারা ফ্রি ডাউনলোড করুন ।ইসলামীক বাংলা বইয়ের লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুনমাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন

কাপড় পরিধান বিষয়ক সুন্নাত ও আদব

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আল্লাহর দরবারে লক্ষ কোটি কৃতজ্ঞতা যে, তিনি আমাদেরকে কাপড় পরিধানের যোগ্যতা দান করেছেন, পক্ষান্তরে অন্যান্য জীব জন্তুর নিকট কাপড় পরিধানের যোগ্যতা নেই।পোষাক পরিচ্ছদ দ্বারা আমরা লজ্জাস্থান ঢাকতে পারি, ঠান্ডা ও গরম থেকে বাঁচতে পারি। আর কাপড় চোপড় আমাদের মান মর্যাদা সৌন্দর্য কে বহুগুনে বাড়িয়ে তোলে। তবে নানা সম্প্রদায়ের নানা ধরণের পোষাক হয়ে থাকে কিন্তু সর্বাপেক্ষা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত, সম্মানিত ও স্বতন্ত্র হচ্ছে মুসলমানের পোষাক। নিম্নে পোষাকের ব্যাপারে কতিপয় সুন্নাত ও আদাব পেশ করা হলো-
۞ সাদা রংয়ের পোষাক সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। এ রংয়ের পোষাক ছিল নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর অত্যন্ত পছন্দনীয় ও প্রিয়তর। হযরত সায়্যিদুনা সুমরা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন: নবীয়ে পাক, সাহেবে লাওলাক, হুযুর পুর নূর صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন, “তোমরা সাদা পোষাক পরিধান করো, কেননা তা অত্যন্ত পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন এবং তা দ্বারা তোমরা মৃতদের কাফন পরিধান করাবে।”(সুনানে তিরমিযী শরীফ, হাদিস নং-২৮১৯, খন্ড-৪র্থ, পৃষ্ঠা-৩৭০)
۞ কাপড় পরিধান কালে নিন্মোক্ত দোয়াটি পাঠ করুন, তাতে পূর্বাপর গুনাহ্ গুলো মাফ হয়ে যায়- اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِىْ كَسَانِىْ هٰذَا وَرَزَقَنِيْهِ مِنْ غَيْرِحَوْلٍ مِّنِّىْ وَلَا قُوَّة অর্থাৎ ‘সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্ তাআলার জন্যে, যিনি আমাকে এ কাপড়টি পরিধান করিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে আমার শক্তি সামর্থ্য ব্যতিরেকে তা তিনি আমাকে দান করেছেন।(আল মুস্তাদরাক, হাদিস নং-৭৪৮৬, খন্ড-৫ম, পৃষ্ঠা-২৭০)
۞ কাপড় চোপড় পরিধান কালে ডান দিক থেকে আরম্ভ করা। উদাহরণ স্বরূপ জামা বা পাঞ্জাবী গেঞ্জী ইত্যাদি পরিধান কালীন প্রথমে ডান হাত প্রবেশ করিয়ে পরে বাম হাত প্রবেশ করানো অনুরূপভাবে পায়জামা বা লুঙ্গি পরিধান কালেও। জামা, কাপড়, লুঙ্গি ইত্যাদি খোলার সময় বিপরীত তথা প্রথমে বাম হাত ও পা থেকে পরে ডান হাত ও পা দিয়ে খুলতে হবে। হযরত সায়্যিদুনা আবু হুরায়রা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم যখন জামা কাপড় পরিধান করতেন তখন ডান দিক থেকে আরম্ভ করতেন।” (সুনানে আবি দাউদ শরীফ, হাদিস নং-৪১৪১, খন্ড-৪র্থ, পৃষ্ঠা-৯৬)
۞ প্রথমে পাঞ্জাবী তারপর পায়জামা পরিধান করবে।
۞ পাগড়ী পরিধানে অভ্যস্থ হওয়া। হযরত সায়্যিদুনা ওবাদাহ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “নবী করিম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: ‘তোমরা পাগড়ী পরিধান করো কেননা এটা নূরানী ফেরেশতাদের নিদর্শন এবং পাগড়ী শিমলাহ্ (পেছনের ঝুলন্ত অংশটি) পিঠের পেছনে ঝুলিয়ে দাও।’(কানযুল উম্মাল, হাদিস নং-৪১১৪৩, খন্ড ৮ম, পৃষ্ঠা-১৩৩) পাগড়ী পড়ে দু’রাকাত নামায আদায় করা পাগড়ী বিহীন সত্তর রাকাত নামাজ আদায়ের চেয়েও অধিক ফজিলতপূর্ণ। (কানযুল উম্মাল, হাদিস নং-৪১১৩০, খন্ড-১৫তম, পৃষ্ঠা-৩৩)
۞ বালক বালিকাদের কাপড় চোপড়ে পার্থক্য রাখতে হবে, বালাকদেরকে পুরুষের বালিকাদেরকে মহিলাদের পোষাক পরিধান করাতে হবে। আর যখন তারা প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে যাবে তখন তাদের লজ্জা ঢাকা যায় এমন পোষাক পরাতে হবে। হযরতে সায়্যিদাতুনা আয়েশা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهَا হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “একদা হযরত সায়্যিদাতুনা আসমা বিনতে আবি বকর رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهَا পাতলা কাপড় পরিধান করে নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর সামনে আগমন করলে নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বললেন: হে আসমা! বালিকা যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে যায় তখন তার দেহের হাতগুলোর কবজি ও মুখমন্ডল ব্যতিত অন্য কোন অঙ্গ যাতে দেখা না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হয়।”(সুনানে আবি দাউদ শরীফ, হাদিস নং-৪১৪০, খন্ড-৪র্থ, পৃষ্ঠা-৮৫)
۞ হযরত সায়্যিদুনা আলকামা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, হযরতে হাফসা বিনতে আবদুর রহমান رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهَا একটি পাতলা ওড়না হযরতে সায়্যিদাতুনা আয়েশা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهَا এর খেদমতে পরিধান করে আগমন করলে হযরত আয়েশা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهَا তা ফেলে দিয়ে একটি মোটা উরনা পরিধান করিয়ে দিলেন। (মোয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস নং-১৭৩৯, খন্ড-২য়, পৃষ্ঠা-৪১০)
মাসআলাঃ মহিলাদের যে সকল কাপড় পরিধান করলে তাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দেখা যায় এ ধরণের কাপড় পরিধান করা যেমন হারাম তেমনিভাবে পুরুষদের বেলায় ও লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয় এরকম কাপড় পরিধান করা হারাম। ছোট্ট বালিকা ও বালকদেরকে শিশুকাল থেকে সতর ঢেকে রাখা, ওড়না বোরকা ইত্যাদি মোটা কাপড় পরিধানের অভ্যাস গড়ে তোলা মা বাবা অভিভাবক সহ সকলেরই কর্তব্য। তাহলে প্রাপ্ত বয়স্ক হলেও লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার উপর উদ্দ্যোগী হয়ে উঠবে। হে আল্লাহ্! আমাদেরকে তোমার প্রিয় বন্ধু সরওয়ারে কায়েনাত, ফখরে মাওজুদাত صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর সুন্নাত অনুযায়ী কাপড় পরিধানের তৌফিক দিন। আমীন বিজাহিন্নাবিয়্যিল আমিন! صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم——–লিখাটি আমীরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা “মুহাম্মদ ইলয়াস আত্তার” কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত ২৪ পৃষ্ঠা সম্বলিত “কালো বিচ্ছু” নামক রিসালার ২১-২৪ নং পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই রিসালাটি অবশ্যই সংগ্রহে রাখুন। অন্যকে উপহার দিন। যারা মোবাইলে (পিডিএফ) রিসালাটি পড়তে চান তারা ফ্রি ডাউনলোড করুন ।ইসলামীক বাংলা বইয়ের লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুনমাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন

কালো বিচ্ছু (দাঁড়ি রাখার বিধান সম্বলিত)

কথিত আছে, একবার কোয়েটার নিকটবর্তী এক গ্রামে ‘ক্লিন শেভ’করা এক বেওয়ারিশ যুবকের লাশ পাওয়া যায়। প্রয়োজনীয় কাজকর্ম শেষে লোকজন মিলে লাশটি দাফন করে দিল। ইত্যবসরে মৃতের ওয়ারিশগণ খোঁজ খবর নিয়ে সেখানে এসে পৌঁছল। তারা লোকজনের সামনে তাদের ইচ্ছা প্রকাশ করল যে, তাদের এই প্রিয়জনের লাশটি তাদের গ্রামে নিয়ে গিয়ে সেখানে দাফন করতে চায়। অতএব, কবরের মাটি সরিয়ে ফেলা হল। লাশটির মুখের দিক হতে যখন পাথরের খন্ডটি সরিয়ে ফেলা হল তখন মৃতের অবস্থা দেখে লোকদের মুখ থেকে ভয়ঙ্কর চিৎকার বেরিয়ে আসল। কারণ, এইমাত্র যে যুবকটির লাশ দাফন করা হয়েছে, তার মুখ কাল দাঁড়িতে ছেয়ে গেছে, আর সে দাঁড়ি কালো চুলের নয় বরং তা ছিল কালো কালো বিচ্ছুরই। ভয়ঙ্কর, লোমহর্ষক এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত লোকজন ইস্তেগফার পড়তে থাকে এবং তাড়াতাড়ি কবরটি ঢেকে দিয়ে ভয়ে সকলে পালিয়ে গেল।
লাশ বের করার জন্য পুনরায় কবর খোঁড়া কেমন? প্রিয় প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! কোয়েটার ঘটনায় লাশটি নিয়ে যাবার জন্য কবর খোঁড়ার আলোচনা রয়েছে। এই সুযোগে এখানে এই ব্যাপারে জরুরি মাস্আলাটিও জেনে নিন যে, শরয়ী অনুমোদন ব্যতিত কবর খোঁড়া হারাম। আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বলেছেন: (পুনরায়) কবর খোঁড়া হারাম, হারাম এবং কঠোর হারাম। আর এতে করে মৃত ব্যক্তির মারাত্মক অসম্মানি হয় এবং আলাহ তাআলার গোপন রহস্যকে হেয় করা হয় ।[ফাতাওয়ায়ে রজভীয়া। ৯য় খন্ড, পৃষ্ঠা : ৪০৫]
দাঁড়ি মুন্ডিয়ে যখনই গোসলখানায় প্রবেশ করল …একবার সাগে মদীনা عُفِىَ عَنْهُ এর (অর্থাৎ লেখকের) উক্ত ঘটনাটি শুনে (বাবুল মদীনা, করাচীর) এক যুবক আল্লাহ তাআলার ভয়ে মুখে দাঁড়ি সাজিয়ে নেয়। কিন্তু পরিবার-পরিজনের বাধায় আর বিয়ের প্রলোভনে পড়ে সেও দাঁড়ি মুন্ডিয়ে ফেলে। কিন্তু কালো বিচ্ছুর ঘটনাটি তার মন থেকে মুছে যায়নি। শেভ করার পর গোসলখানায় প্রবেশ করতেই সে হতবাক হয়ে গেল যে, সেখানে একটি কাল কীট হামাগুড়ি দিচ্ছিল। এ অবস্থা দেখেই সে তৎক্ষণাৎ দাঁড়ি মুন্ডানো থেকে তওবা করে নিল এবং اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ عَزَّوَجَلّ পুনরায় দাঁড়ি রাখা শুরু করে দিল।
দাঁড়িগুলোকে ছেড়ে দাওরাসুলের মহব্বতের পিপাসীরা! আলাহর হাবীব صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর এই মহান বাণীটি বারবার পাঠ করতে থাকুন যে, “তোমাদের গোঁফগুলো খুবই খাটো করো আর দাঁড়িগুলোকে ছেড়ে দাও (অর্থাৎ লম্বা করো), ইহুদীদের মত আকৃতি বানিও না।”[ইমাম তাহাবী কৃত শরহে মাআনিল আছার ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা : ২৮।]
মৃত্যুর পর হৃদয় বিদারক দৃশ্যওহে অলস ইসলামী ভাইয়েরা! একটু ভাবুন। মৃত্যুর পর আপনার কিছুই চলবে না। আপনাকে যারা আনন্দ দিত তারা আপনার কাপড়- চোপড় পর্যন্ত খুলে নেবে। আপনি যত মর্যাদাশীলই হোন না কেন, আপনাকে সেই কাফনই পরানো হবে যা পরানো হয়ে থাকে ফুটপাতে পড়ে থাকা বেওয়ারিশ লাশদেরকে। আপনার গাড়ি আছে, সেটি গ্যারেজেই দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনার দামী দামী পোষাক সিন্দুকেই থেকে যাবে। আপনার ধন-সম্পদ, আপনার রক্তে উপার্জিত ঘামঝরা পরিশ্রমে অর্জিত সম্পদ আপনার ওয়ারিশরা দখল করে নেবে। আপনজনরা চোখের পানি ফেলতে থাকবে। আর অনাত্মীয়রা খুশি আনন্দ করতে থাকবে। আপনাকে যারা আনন্দ দিত তারা আপনার লাশ কাঁধে উঠিয়ে রওয়ানা দেবে। আপনাকে নিয়ে আসবে এমন এক বিরাণ ভূমিতে যেই ভয়ঙ্কর জায়গায় আপনি কখনও আসেননি। বিশেষ করে রাতে আপনি এক মুহুর্তের জন্যও সেখানে একাকী আসেননি। কখনও আসতে পারতেনও না। বরং সেই স্থানের নাম শুনতেই আপনি ভয়ে কেঁপে উঠতেন। এখন গর্ত খুঁড়ে আপনাকে বুক সমান মাটির নিচে দাফন করে আপনার সব বন্ধু-বান্ধব ফিরে যাবে। আপনার পাশে এক রাত তো দূরের কথা এক ঘণ্টা সময়ের জন্যও কেউ থাকতে রাজি হবে না। চাই সে আপনার প্রাণপ্রিয় পুত্রই হোক না কেন, সেও পালিয়ে দূরে সরে যাবে। এবার এই অন্ধকারের ছোট কবরে জানা নেই কত হাজার কোটি বছর আপনাকে থাকতে হবে। আপনি চিন্তিত হবেন, দু:খিত হবেন। আপনার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে। এদিকে কবর চাপ দিতে থাকবে। আর আপনি চিৎকার করতে থাকবেন। করুণ দৃষ্টিতে দেখতে থাকবেন আপনার বন্ধু-বান্ধবদের চোখের আড়াল হওয়ার দৃশ্য, আপনার মন ভেঙ্গে চুরমার হতে থাকবে। ইত্যবসরে কবরের দেওয়ালগুলো ভূমিকম্পের ন্যায় দুলতে আরম্ভ করবে। দেখতে দেখতে দুইজন ভয়ানক আকৃতির ফিরিশতা (মুনকার ও নকীর) লম্বা লম্বা দাঁত নিয়ে কবরের দেওয়ালগুলো চিড়তে চিড়তে আপনার সামনে এসে উপস্থিত হবে। তাদের চোখ দিয়ে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হতে থাকবে।ভয়ঙ্কর কালো কালো চুল আপাদমস্তক ঝুলতে থাকবে। আপনাকে তারা হুঙ্কার দিয়ে ঝাটকি মেরে বসাবে। অত্যন্ত কঠোর ভাষায় আপনাকে প্রশ্ন করবে “مَنْ رَّبُّكَ؟ তোমার রব কে?” “ دِيْنُكَ؟ مَا তোমার ধর্ম কী?” ইত্যবসরে আপনার ও মদীনা শরীফের সাথে যত পর্দা প্রতিবন্ধক হয়ে ছিল, সবগুলো উঠিয়ে দেয়া হবে। কারো যেন মনোমুগ্ধকর, আদুরে আদুরে সুপ্রিয় চেহারা আপনার সামনে দেখা দিবে, অথবা সে মহান স্বত্তা আপনার সামনে স্বয়ং আগমন করবেন। আশ্চর্যের কী যে, আপনার চক্ষুদ্বয় লজ্জায় অবনত হয়ে যাবে। হতে পারে, আপনি চিন্তায় পড়ে যাবেন যে, এ চোখ উঠাই কোন্ সাহসে? নিজের বিকৃত কুৎসিৎ চেহারা দেখাই কিভাবে? ইনি তো সেই সত্ত্বা যিনি আমার প্রিয় আকা মুহাম্মদুর রাসূলুলাহ صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّمআমি যাঁর কলেমা পড়তাম। নিজেকে তাঁর গোলাম বলেও দাবী করতাম। কিন্তু আমি এ কী করলাম? প্রিয় আকা ও মুনিব صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم তো আদেশ দিয়েছিলেন, দাঁড়ি লম্বা কর, গোঁফ ছোট করে ছেঁটে ফেল, ইহুদীদের মত আকৃতি বানিওনা। কিন্তু হায় আমার দুর্ভাগ্য! কয়েকদিনের পার্থিব সৌন্দর্য্যরে জন্য নিজের জীবনটাকে খুইয়ে দিয়েছি। ফ্যাশন আমাকে ধ্বংস করে দিল। প্রিয় মুনিব ও আকা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আমি আমার চেহারা ইহুদীদের মত অর্থাৎ মাদানী আকা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর দুশমনদের ন্যায় বানিয়ে রেখেছিলাম। হায়! এখন কী অবস্থা হবে আমার! আর এমন যেন না হয় যে, আমার বিকৃত এই চেহারা দেখে আমার মাদানী আকা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم চেহারা মুবারক ফিরিয়ে নেন, আর এই ঘোষণা দেন যে, এ তো আমার দুশমনদের চেহারা, গোলামদের মত তো নয়।আল্লাহ না করুন, এমন যদি হয়ে থাকে তাহলে একটু ভাবুন, তখন আপনার কী অবস্থা হতে পারে?
না উঠ্ সাকে কিয়ামত তলক খোদা কি কসমআগর নবী নে নজর ছে গিরা কে ছোড় দিয়া।
এমন হবে না, اِنْ شَاءَ الله عَزَّوَجَلّ কখনও হবে না! আপনি তো এখনও জীবিত আছেন। সবকিছু মেনে নিন! নিজের দুর্বল শরীর নিয়ে একটু ভাবুন। মনে সাহস সঞ্চয় করুন। ইংরেজ ফ্যাশন, ইংরেজ কৃষ্টি- কালচারকে তিন তালাক দিন আর আপনার চেহারাকে প্রিয় নবী মাদানী আকা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর পবিত্র সুন্নাত দিয়ে সাজিয়ে নিন এবং এক মুষ্ঠি দাঁড়ি সাজিয়ে নিন। কখনও শয়তানের এই প্রতারণায় পড়বেন না, শয়তানের এরূপ কুমন্ত্রণায় মন দেবেন না যে, “এখনও তো আমার দাঁড়ি রাখার সময় হয়নি, আমার বয়সই বা আর কত? আমার এত জ্ঞানই বা কোথায়? কেউ যদি দ্বীন ধর্মের বিষয়ে কোন প্রশ্ন করে বসে তবে আমি তো এর উত্তর দিতে পারব না। সুতরাং আমি যখন বড় হব, যোগ্য হব, তখনই দাঁড়ি রাখব।” মনে রাখবেন, এ হল শয়তানের সরাসরি আক্রমণ যে, মানুষ নিজের ব্যাপারে এমনই ভাবতে থাকুক যে, হ্যাঁ, আমি এখন যোগ্য হয়ে গেছি।” মনে রাখবেন, নিজেকে নিজে যোগ্য মনে করাই অযোগ্যতার বড় প্রমাণ। নিজেকে নিজে ছোট ভাবুন। যেখানে বড় বড় আলেমগণও সকল প্রশ্নের উত্তর দেননা। সেখানে আপনি কি সব ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন ? নফসের প্রতারণার শিকার হবেন না। নিজের অপারগতাকে স্বীকার করে নিন, আনুগত্যে আসুন। আপনার মাতা আপনাকে বাধা দিক, পিতা আপনাকে নিষেধ করুক, সমাজ আপনাকে ধিক্কার দিক। বিয়েতে বাধা আসুক। যা-ই হোক না কেন, আল্লাহ্ তাআলা ও তাঁর প্রিয় রাসুল صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর আদেশ আপনাকে মানতেই হবে। মনে পূর্ণ আশা রাখুন! পবিত্র লওহে মাহফুজে যদি আপনার জোড়া লিখা হয়ে থাকে, তবে বিয়ে আপনার হবেই হবে। আর যদি আপনার জোড়া লেখা না থাকে, তবে পৃথিবীর কোন শক্তি আপনাকে বিয়ে করাতে পারবে না। জীবনের ভরসা কোথায়?
দাঁড়ি মুন্ডাতেই মৃত্যুকোন ব্যক্তি সাগে মদীনা عُفِىَ عَنْهُ কে (লিখককে) এ ধরনের একটি ঘটনা শুনান যে, বাংলাদেশের এক যুবক দাঁড়ি রেখেছিল। যখন তার বিয়ের সময় ঘনিয়ে আসে, তার মা-বাবা তাকে দাঁড়ি মুন্ডাতে বাধ্য করে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে নাপিতের কাছে গিয়ে দাঁড়ি মুন্ডিয়ে ঘরে আসার পথে রাস্তা পার হচ্ছিল। হঠাৎ দ্রুতগামী একটি গাড়ি এসে তাকে চাপা দিয়ে চলে গেল আর তৎক্ষণাত তার মৃত্যু হল। তার বিয়ের সাধ মাটি হয়ে গেল। এখন মা-বাবা তার কী কাজে আসবে? না বিয়ে হল, না দাঁড়ি থাকল।অতএব, প্রিয় প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! সাবধান হয়ে যান। আলাহ তাআলার উপর ভরসা করে আজই সংকল্প করুন যে, এখন থেকে আমি তাজেদারে রিসালত, নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর মুহাব্বতে গর্দান দিয়ে দিতে পারি, কিন্তু আমার মুখের দাঁড়ি পৃথিবীর কোন শক্তি ছিনিয়ে নিতে পারবে না। সাবাশ! ধন্য! ধন্য!!
দাঁড়ি-মুন্ডানকারীদের ব্যাপারে মাদানী আকা ﷺ এর ঘৃনাভরা এক শিক্ষণীয় ঘটনা ইরানের সবচেয়ে নিকৃষ্ট কুকুর (বাদশাহ্) খসরু পারভেজের নিকট হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ এর মাধ্যমে মদীনার তাজেদার, উভয় জগতের সরদার صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর পক্ষ থেকে নেকির দাওয়াত সম্বলিত একটি চিঠি মোবারক পৌঁছে। সেই জালিম নবী-বিদ্বেষী পারভেজ পত্রবাহককে দেখতেই ক্ষোভে রাগে তাঁকে শহীদ করে ফেলে এবং তার বদ-জবানে গালমন্দ করতে থাকে।(পারভেজের বে-আদবীমূলক ও ঔদ্বত্যপূর্ণ শব্দগুলো উল্লেখ করার সাহস হচ্ছে না, তাই উহ্য রেখে দিলাম।) এর পর ইরানের কুকুর (পারভেজ) তার ইয়ামেনে নিয়োজিত গভর্ণর বাজানকে (যার অধীনে আরবের সকল রাষ্ট্র ছিল) এই হুকুম পাঠাল যে, ………………(এখানেও ইরানের কুকুর পারভেজের গালমন্দ উহ্য রাখা হল)। বাজান একটি সেনাদল তৈরি করল। সেনাপতির নাম ছিল ‘খারখাসরা’। তাছাড়া মদিনার তাজেদার, উভয় জগতের সরদার, হুযুর নবী করীম রউফুর রাহিম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর কর্মকান্ড ও রীতি-নীতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য রাষ্ট্রীয় এক প্রধানকেও তার সাথে দেওয়া হল। তার নাম ছিল ‘বানুয়া’। এই দুই প্রধান যখন মদীনার তাজেদার, উভয় জগতের সরদার صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর দরবারে এসে পৌঁছাল, নবী-প্রতাপে তাদের গর্দানের শিরাগুলো কাঁপতে আরম্ভ করে দিল। যেহেতু এরা ছিল পারস্য অগ্নিপূজারী তাই তাদের মুখের দাঁড়ি ছিল মুন্ডানো আর গোঁফগুলো এতই লম্বা ছিল যে, তাদের মুখ পর্যন্ত ঢাকা ছিল। তারা তাদের বাদশাহ্ পারভেজকে ‘রব’ বলত। তাদের চেহারা দেখতেই প্রিয় আকা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ব্যথিত হলেন। ঘৃনাভরে বললেন, “তোমাদের ধ্বংস হোক, এরূপ আকৃতি বানাতে তোমাদের কে বলেছে?” তারা জবাব দিল, “আমাদের ‘রব’ পারভেজ বলেছে।” প্রিয় আকা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করলেন: “কিন্তু আমার রব (আল্লাহ) তাআলা তো আমাকে আদেশ দিয়েছেন, দাঁড়ি বাড়াও আর গোঁফ ছাটো।” [মাদারিজুন্নবুয়ত, খন্ড : ২য়। পৃষ্ঠা : ২২৪, ২২৫। ফাতাওয়ায়ে রজভীয়া, খন্ড : ২২, পৃষ্ঠা : ৬৪৭]
কিয়ামতের হৃদয়-কাপাঁনো দৃশ্য প্রিয় প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! এই ঘটনাটির প্রতি গভীর দৃষ্টি দিন। ভাবুন। বুঝে না এলে পুনরায় পড়ুন । গভীর চিন্তা করুন। দুইজনলোক, যারা এখনও কাফের, মুসলমান হয়নি। শরীয়তের আদেশ-নিষেধ সম্পর্কেও সম্পূর্ণ অজ্ঞ এবং মুকাল্লিফও নয় (অর্থাৎ শরীয়তের বিধি নিষেধ এখনও তাদের উপর বর্তায়নি।) কিন্তু তারা স্বাভাবিক সৃষ্টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে, চেহারার স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে ধ্বংস করে দিয়েছে, মদীনার তাজেদার, উভয় জগতের মালিক ও মুখতার, নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর দৃষ্টি মোবারকে তাদের এই (অর্থাৎ দাঁড়ি মুন্ডানোর) কাজটি অত্যন্ত গর্হিত মনে হল। আর তিনি নিখিল বিশ্বের রহমত হওয়া সত্ত্বেও ইরশাদ করলেন: ‘তোমাদের ধ্বংস হোক’। একটু ভাবুন। বুঝার চেষ্টা করুন। কিয়ামতের ময়দানে যখন সবাই একত্রিত হবে, সকলে যখন নফসী নফসী করবে, মা তার সন্তান থেকে আর সন্তান তার পিতা থেকে পালিয়ে বেড়াবে, সে সময় তো একমাত্র পবিত্র সত্ত্বা হুযুর মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ই থাকবেন, যিনি হবেন গুনাহ্গারদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। এই মদীনার তাজেদার, নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর পবিত্র খেদমতে সবাইকে উপস্থিত হতে হবে। মনে রাখবেন! যে ব্যক্তি যে অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে, তাকে সে অবস্থাতেই কিয়ামতের দিন উঠানো হবে। দাঁড়িওয়ালারা উঠবে দাঁড়ি মুখে, আর দাঁড়িহীনরা উঠবে দাঁড়ি বিহীন অবস্থায়। ওহে মাহবুব صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর সুন্নাত ধ্বংসকারীরা! প্রাণপ্রিয় সরকার, শাহান শাহে আবরার, হুযুর নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم যদি আপনাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কি আমাকে এখনও ভালবাস? দিবালোকের ন্যায় এটা স্পষ্ট যে, আপনি অস্বীকার করতেই পারবেন না। তখন আপনি এটাই বলবেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহصَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ! আপনিই তো আমাদের সব কিছু।আমরা আপনাকে আমাদের মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততি, ধন-দৌলত সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় জানি। হে আমাদের সরকার ! আমরা তো পৃথিবীতে ঝুম ঝুম করে আপনার দরবারে আরজ করতাম,
“মেরে তো আপ হি সব কুছ হেঁ রহমতে আলম! মাঁই জী রাহা তোঁ জমানে মেঁ আপ হি কে লিয়ে।”
ওহে হুজুর পুরনূর صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم! আমরা তো আপনার জন্য মন পাগলপারা ছিলাম যে, অস্থির হয়ে আমরা আরজ করতাম,
“গোলামে মোস্তফা বন কর মাঁই বিক জাওঁ মদীনে মেঁ মোহাম্মদ নাম পর সওদা সরে বাজার হো জায়ে!”
ওহে আমাদের প্রিয় মুনিব صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ! আমাদের ভালবাসার সাগরে যখন খুব বেশি জোশ উঠত, তখন এমনও বলে দিতাম,
“জান ভি মাঁই তো দে দোঁ খোদা কি কসম! কুঈ মাঙ্গে আগর মোস্তফা কে লিয়ে।”
এসব শুনে (আল্লাহ না করুন) প্রিয় আকা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم হয়ত এ কথা বলবেন, “হে আমার গোলামরা! তোমরা যদি সত্য সত্য আমাকে মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততি এবং ধন-দৌলত থেকে বেশি ভালবাসতে, কেবল আমার জন্যই পৃথিবীতে জীবিত ছিলে, আমার নামেই যদি বিক্রি হওয়ার বাসনায় থাকতে, বরং জীবনও দিয়ে দিতে তৈরি থাকতে, তা হলে কারণটি কী ছিল যে, তোমরা তোমাদের আকার-আকৃতি আমার দুশমনদের ন্যায় বানিয়ে রাখতে? আমার এ সব আদেশ-নিষেধ কি তোমাদের পর্যন্ত পৌঁছেনি। গোঁফগুলো ছোট করবে, দাঁড়িগুলোকে বাড়তে দাও, ইহুদীদের মত আকৃতি বানিও না।” [ইমাম তাহাবী প্রণিত শরহে মাআনিল আছার খন্ড : ৪র্থ, পৃ-২৮।]। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত অনুযায়ী চলে, সে আমার, আর যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত হতে মুখ ফিরিয়ে রাখে, সে আমার নয়। [কানযুল উম্মাল। খন্ড ৮ম পৃষ্ঠা : ১১৬। হাদীস নম্বর : ২২৭৪৯]। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতের উপর আমল করে না, সে আমার দলভূক্ত নয়। [সুনানে ইবনে মাজাহ্। খন্ড : ২য়। পৃষ্ঠা : ৪০৬। হাদিস নম্বর : ১৮৪৬।]
যদি আকা ﷺ মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে …! ফ্যাশন জগতে প্রাণ উৎসর্গকারীরা! এসব মহান বাণী স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পরও আল্লাহ না করুন আমাদের প্রিয় মক্কী মাদানী আকা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তখন আপনি কী করবেন? কার দ্বারে গিয়ে আবেদন করবেন? কার দরজায় শাফাআতের ভিক্ষা নিতে যাবেন? আল্লাহ তাআলার গজব ও আজাব হতে বাঁচাবেন কে? এখনও সুযোগ আছে। যতদিন নিশ্বাস আছে, সময় আছে, শীঘ্রই তওবা করে নিন। আপনার চেহারাকে প্রিয় আকা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّمএর সুমধুর প্রিয় সুন্নাত দিয়ে সাজিয়ে নিন। আপনার চেহারায় নবী প্রেমের নিদর্শন সৃষ্টি করে নিন। এই সুখের চিন্তাটি বাদ দিন যে, এখন বয়সই বা আর কত? পরে না হয় রেখে নিব,বিয়ের পরে দেখা যাবে। হে আমার সরলসোজা ইসলামী ভাইয়েরা! শয়তানের পাতা ফাঁদে পা দিবেন না। সে কতই না মিষ্টি ভাষায় আপনাকে এ কথা বুঝাতে চেষ্টা করবে যে, এখনও দাঁড়ি রাখার বয়স তোমার হয়নি। পরে না হয় রেখে দিও। এটা শয়তানের সফল কৌশল। এই অপকৌশল ব্যবহার করে এই মর্দুদ জানি না কত মানুষকে যে ধ্বংস করে দিয়েছে। আসুন আপনাদেরকে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা শুনাই :
মৃত্যুর পূর্বে দুর্ভাগ্য এক যুবক কম-বেশি সারা বছর ‘দা’ওয়াতে ইসলামী’র সুন্নাতে ভরা মাদানী পরিবেশের সাথে সংশিষ্ট ছিল।দাঁড়িও রাখল। পরে জানি না কী বুঝল! হয়ত কোন খারাপ বন্ধু জুটেছে আর আল্লাহরই পানাহ দাঁড়ি শেভ করে ফেলল। বৃহস্পতিবার রাতে বাবুল মদীনা করাচীর সাপ্তাহিক সুন্নাতে ভরা ইজতিমায় অনুপস্থিত থাকে। জুমার দিন বন্ধুদের সাথে বাবুল মদীনা করাচীর প্রসিদ্ধ বিনোদনকেন্দ্র ‘হক্স বে’র সমুদ্র সৈকতে পিকনিকে যায়। কিন্তু হায়! বেচারা সমুদ্রের পানিতে ডুবে মৃত্যুর শিকার হয়ে গেল!
মিলে খাক মেঁ আহলে শাঁ কেয়সে কেয়সে মকীঁ হো গায়ে লা মকাঁ কেয়সে কেয়সে। হুয়ে নামওয়র বে নিশাঁ কেয়সে কেয়সে জমীঁ খা গাঈ নও জওয়াঁ কেয়সে কেয়সে। জাগা জী লাগানে কি দুনিয়া নেহিঁ হে ইয়ে ইবরত কি জা হে তামাশা নেহিঁ হে।
ফ্যাশন-পুজারীদের সঙ্গ তওবা তওবা! এই যুবকটির বয়স প্রায় বিশ বছর হবে। কতই বা বয়স! ভেবেছে দাঁড়ি রাখার বয়স এখনও হয়ত আমার আসেইনি! এরূপ ভেবেছে বিধায় তো মৃত্যুর মাত্র পনের দিন পূর্বে কি দাঁড়ি সাফ করে নেয়নি।না, কখনও এটা কাম্য নয়। হায় বেচারার কপাল! আফসোস মন্দ সঙ্গের প্রভাব। ইয়া আল্লাহ্! তাকে ক্ষমা করুন। ডুবে মরা এই যুবকটি আমাদের সকলের উদ্ধারের জন্য অনেক অনেক শিক্ষামূলক বিষয় রেখে গেছে। যেসব ব্যক্তি দা’ওয়াতে ইসলামীর মাদানী পরিবেশ থেকে দূরে সরে যাবার জন্য মনে মনে ইচ্ছা করে কিংবা ভ্রমণ-বিনোদনে মত্তদের সাথে বন্ধুত্ব করে, সে যেন এই শিক্ষণীয় ঘটনার উপর ভাল করে মনোযোগ দেয় যে, আমিও যেন অন্যান্যদের সামনে লাঞ্চনার শিক্ষায় পরিণত হয়ে না যাই। আমার এই ফ্যাশন-পুজারী বন্ধুরা নিজেরা তো ডুবেছেই আমাকেও যেন ডুবাতে না পারে। আর কখনও এমন যেন না হয় যে, আমার জীবনের শেষ মুহুর্তটি উপস্থিত আর সে কারণেই শয়তান তার শক্তি আমার উপর ব্যবহার করছে যেন কিছু সময়ের মন্দ সঙ্গের সংস্পর্শতায় সে আমার জীবনের সব মূল্যবান উপার্জন ধ্বংস করে দিতে পারে। বেনামাযী ও ফাসেকদের সঙ্গদাতাগণ! সাবধান!!! ৭ম পারা, সূরা আল আনআমের ৬৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন: وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطٰنُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرٰى مَعَ الْقَوْمِ الظّٰلِمِينَ (68)
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদঃ“যখনই তোমাকে শয়তান ভুলিয়ে দেবে, অত:পর স্বরণে আসার পর কখনও অত্যাচারীদের সাথে বসবে না।”(পারা-৭ম, সূরা-আনআম, পৃ-৬৮)
রাসূলে পাক ﷺএর পছন্দের দাঁড়িই রাখবে ওহে মাদানী মাহবুব صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর ভালবাসার প্রত্যাশীরা! পরাজয় মেনে নিন! নিজের জীবনের উপর অহংকার করবেন না। পার্থিব নামে মাত্র অপারগতা ও লৌকিক বাধ্যবাধকতাকে বেঁচে থাকার বাহানা বানাবেন না। আসুন! আসুন!! রাসূলে পাক صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّمএর দয়া ও করুনার চাদরে নিজেকে জড়িয়ে নিন। তাঁর পালনকর্তা ও অতিক্ষমাশীল মালিকের নিকট ক্ষমা চেয়ে নিন। তাঁর (অর্থাৎ রাসূলে পাকের) নিকটও ক্ষমা চেয়ে নিন। এ হল দয়া ও করুণার আলীশান দরবার। এ দরবার থেকে কোন ভিক্ষুক খালি হাতে নিরাশ হয়ে ফিরে যায়না। সুন্নাতের ভিক্ষা নিয়ে নিন। আপনার চেহারা হতে আল্লাহ তাআলার ও মোস্তফা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর দুশমনদের সাদৃশ্যতাকে জীবনের জন্য ধুয়ে মুছে সাফ করে নিন। চেহারায় আদুরে আদুরে সুন্নাত সাজিয়ে নিন। আর হ্যাঁ, মনে রাখবেন, শয়তান বড়ই ধোকাবাজ ও প্রতারক। আপনি তো ইংরেজদের এবং ইহুদীদের পাশ ছেড়ে এবার দাঁড়িও সাজিয়ে নিলেন, শয়তান কিন্তু আপনাকে ভিন্ন কৌশলে আবার পথ আগলে ধরবে। আপনাকে যেন আবার ফ্রান্সদের পায়ে নিয়ে ফেলে না দেয়।মূল কথা হল, কখনও ‘ফ্রান্স কাটিং দাঁড়ি’ অর্থাৎ ছোট ছোট খসখসে দাঁড়ি রাখবেন না। কারণ, দাঁড়ি মুন্ডানো এবং দাঁড়ি কেটে এক মুষ্ঠি থেকে ছোট করে ফেলা উভয়টি হারাম। দাঁড়ি রাখবেন, অবশ্যই রাখবেন। তবে প্রিয় মোস্তফা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর পছন্দের দাঁড়িই রাখবেন। অর্থাৎ পূর্ণ এক মুষ্ঠি রাখবেন।
দাঁড়ি ছোট করে ফেলা কারও মতে জায়েয নেই আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ ফাতাওয়ায়ে রজভীয়ার ২২ খন্ডের ৬৫২ পৃষ্ঠায় ‘দুররে মুখতার’, ‘ফতহুল কদীর’ ও‘আল বাহরুর রায়িক’ ইত্যাদি প্রণিধানযোগ্য ফিকহের কিতাবের বরাত দিয়ে বর্ণনা করছেন, “দাঁড়ি এক মুষ্ঠি থেকে কম থাকা অবস্থায় তা থেকে ছাটা, যেমনটি করে থাকে কোন কোন পাশ্চাত্য নপুংসকেরা, এরূপ করাটা কারো মতেই জায়েয নেই। আর সম্পূর্ণটাই মুন্ডিয়ে ফেলাও অগ্নিপূজারী, ইহুদী, হিন্দু এবং কোন কোন ইংরেজদেরই কাজ। [গুনিয়াতু যাভীল আহকাম ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা : ২০৮ । আল বাহরুর রায়িক, খন্ড-৬, পৃষ্ঠা :৪৯০। ফতহুল কদীর। খন্ড : ২য়। পৃষ্ঠা : ২৭০।]
দাঁড়ি-মুন্ডানো লোকেরা দুর্ভাগা দাঁড়ি যারা ছেটে ছোট করে রাখে বরং যারা একেবারেই রাখে না, তারা যেন সম্মানিত ফকীহগণের উক্ত বিবৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। বরং শিক্ষণীয় বিষয়ের সব চেয়ে বড় শিক্ষণীয় হল এই যেমন-আলা হযরত ইমামে আহলে সুন্নাত, মুজাদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত, আলিমে শরীয়ত, পীরে তরীকত, হযরত আল্লামা মাওলানা আলহাজ্ব হাফেজ কারী শাহ ইমাম আহমদ রেযা খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ স্বীয় কিতাব ‘লামআতুদ্ব দ্বোহা’য় হযরত সায়্যিদুনা কা’আবুল আহবার رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ প্রমূখগণের বাণী উদ্বৃতি করেছেন, “শেষ জমানায় এমন কিছু লোক হবে, যারা দাঁড়ি ছাটবে। তারা একান্তই দুর্ভাগা। অর্থাৎ তাদের জন্য ধর্মে কোন অংশ নেই। আখিরাতেও নেই কোন প্রাপ্তি।” [ফাতাওয়ায়ে রজভীয়া। খন্ড : ২২। পৃষ্ঠা : ৬৫১]। দেখলেন তো আপনারা! দাঁড়ি কেটে যারা এক মুষ্ঠি হতে কম করে ফেলে তারা দ্বীন ও দুনিয়া এবং আখিরাতে কতই দুর্ভাগা।
সরকার কা আশেক ভি কিয়া দাঁড়ি মুন্ডতা হে! কিঁউ ইশক কা চেহরে সে ইজহার নেহিঁ হোতা।
মাদানী বাসনা আল্লাহর ইহসানের জন্য তাঁর প্রতি হাজার প্রশংসা যাদের তৌফিক হয়েছে, নিজেদের চেহারাকে মোস্তফা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর দুশমনদের অপায়া থেকে পবিত্র রেখে সুন্নাত দিয়ে সাজিয়ে নিয়েছেন।এবার তাদের উচিত হবে, যেহেতু এতদিন পর্যন্ত দাঁড়ি মুন্ডিয়ে ছিল,তাই এর জন্য তওবাও করে নেয়। সাথে সাথে এটাও চেষ্টা করবে,নিজেদের মাথার চুলও যেন ইংরেজদের স্টাইলে রাখা না হয়। বরং সুন্নাত অনুযায়ী বাবরী চুল রাখবে। মাথায় সর্বদা পাগড়ী শরীফ সাজিয়ে রাখবে। কারণ হুজুরে আনওয়ার صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّمসর্বদা আপন নূরানী মাথা মোবারকে টুপি শরীফের উপরে পাগড়ী শরীফ সাজিয়ে রাখতেন। পাগড়ী শরীফ হল সুন্নাতে লাযেমা দায়েমা মুতাওয়াতিরা (অর্থাৎ আবশ্যিক সার্বক্ষণিক ধারাবাহিক সর্বজন গৃহীত সুন্নাত)। মদীনার তাজেদার صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেছেন:“পাগড়ী বাঁধ, তোমাদের ধৈর্যশক্তি বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ সহনশীলতায় যথেষ্ট বৃদ্ধি ঘটবে।”[ইমাম হাকিম প্রণীত আল মুস্তাদরাক, খন্ড-৫ম, পৃষ্ঠা : ২৭২, হাদিস : ৭৪৮৮]অন্যত্র বলেন: رَكعَتَانِ بِعِمَامَةٍ خَيْرِ مِّنْ سَبعَينِ رَكعضةً بِلَا عِمَامَةٍ অর্থাৎ “পাগড়ী সমেত দুই রাকাত নামায পাগড়ীবিহীন সত্তর রাকাত নামাযের চেয়ে শ্রেয়।”[ইমাম সুয়ুতী কৃত আল জামিউস সগীর, পৃষ্ঠা : ২৭৩। হাদিস : ৪৪৬৮] এ ছাড়াও পোষাক-আশাকও সাদা রঙের পড়বেন। যে কোন ধরনের ফ্যাশন ভাব পরিহার করে সর্বদা সাদা-সিধা পোষাক পরিধান করবেন। ইংরেজ পোষাক এড়িয়ে চলবেন। প্রত্যহ পাঁচ ওয়াক্ত নামায তাকবীরে ঊলার সাথে জামাত সহকারে আদায় করবেন। অযথা হাসি- ঠাট্টা, উপহাস এবং অনর্থক কথা-বার্তা বলার অভ্যাস পরিত্যাগ করুন আপনি একজন সম্মানি মুসলমান হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করবেন। যেখানেই ‘দা’ওয়াতে ইসলামী’র সুন্নাতে ভরা ইজতেমায় যোগ দেওয়া সম্ভব হয়, অবশ্যই শরীক হবেন। জীবনকে আমল সমৃদ্ধ করার জন্য দৈনিক ফিকরে মদীনার মাধ্যমে মাদানী ইনআমাতের রিসালা পূরণ করে প্রত্যেক মাদানী মাসের প্রথম দশ দিনের মধ্যে আপনার এলাকার দা’ওয়াতে ইসলামীর যিম্মাদারকে জমা দিয়ে দিন। কুরআন ও সুন্নাত প্রচারের বিশ্বব্যাপী অরাজনৈতিক সংগঠন দা’ওয়াতে ইসলামীর মাদানী কাফেলা শহর থেকে শহরে, গ্রামে গঞ্জে প্রতিনিয়ত সফর করতেই থাকে, সুন্নাতের প্রশিক্ষণের জন্য তাঁদের সাথে আপনি অবশ্যই সফর করে আপনার আখিরাতকে উত্তমভাবে সাজিয়ে নিন।——–লিখাটি আমীরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা “মুহাম্মদ ইলয়াস আত্তার” কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত ২৪ পৃষ্ঠা সম্বলিত “কালো বিচ্ছু” নামক রিসালার ৩-২১ নং পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই রিসালাটি অবশ্যই সংগ্রহে রাখুন। অন্যকে উপহার দিন। যারা মোবাইলে (পিডিএফ) রিসালাটি পড়তে চান তারা ফ্রি ডাউনলোড করুন ।ইসলামীক বাংলা বইয়ের লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুনমাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন

ইস্তিখারা কি ও ইস্তিখারার নামাযের পদ্ধতি

ইস্তেখারার শিক্ষা দিতেনমদীনার তাজেদার, হুযুরে আনওয়ার صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم লোকদেরকে গণনার পরিবর্তে ইস্তেখারার শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ থেকে বণির্ত , রাসূলে আকরম, নূরে মুজাসসাম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم কোরআনের সূরা শিক্ষা দেওয়ার ন্যায় আমাদেরকে যে কোন বিষয়ে ইস্তেখারা করার শিক্ষা দিতেন। (বুখারী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, বাবু মা’জা ফিত তাতউয়ি মাছনা মাছনা, ১/ ৩৯৩, হাদীস- ১১৬২)
প্রসিদ্ধ মুফাসসির, হাকীমুল উম্মত হযরত মুফতী আহমদ ইয়ার খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ হাদীস শরীফটির আলোকে লিখেন: ইস্তেখারা মানে হলো মঙ্গল কামনা করা বা কারো নিকট হতে ভাল পরামর্শ গ্রহণ করা। যেহেতু ইস্তেখারার নামাযে এবং দোয়ায় বান্দা যেনো স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার নিকট পরামর্শ চায় যে, অমুক কাজটি করবো কি করবো না! তাই একে ইস্তেখারা বলা হয়। (মিরাতুল মানাজীহ, ২/ ৩০১)
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّدযেই ব্যক্তি ইস্তেখারা করবে সে ক্ষতির শিকার হবে নাহুযূরে আকরাম, নূরে মুজাসসাম, শাফেয়ে বনী আদম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: مَا خَابَ مَنِ اسْتَخَارَ، وَلَا نَدِمَ مَنِ اسْتَشَارَ، وَلَا عَالَ مَنِ اقْتَصَدَ অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইস্তেখারা করবে, সে ব্যক্তি ক্ষতির শিকার হবে না। যে ব্যক্তি পরামর্শের মাধ্যমে কাজ করে, সে আক্ষেপের শিকার হবে না আর যে ব্যক্তি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করবে, সে ব্যক্তি কখনো অভাবে পড়বে না। (মাজমাউয যাওয়ায়িদ, কিতাবুস সালাত, বাবুল ইস্তেখারা, ২/ ৫৬৬, হাদীস- ৩৬৭০)
ইস্তেখারা না করার ক্ষতিপ্রিয় নবী صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: مِنْ شِقَاوَةِ ابْنِ آدَمَ تَرْكُهُ اسْتِخَرَةَ اللهِ অর্থাৎ বান্দার দূর্ভাগ্যের মধ্যে একটি যে, আল্লাহ তায়ালার নিকট ইস্তেখারা না করা। (তিরমিযী, কিতাবুল কদর, বাবু মা’জা ফির রযা বিল কযা, ৪/ ৬০, হাদীস- ২১৫৮)صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّدকোন কোন কাজে ইস্তেখারা করা যায়?কেবল ঐসব কাজের জন্য ইস্তেখারা হতে পারে, যা মুসলমানের রায়ের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন; ব্যবসায় বা চাকুরি থেকে কোনটি বেছে নিলে ভাল হয়? সফরের জন্য কোন দিনটি কিংবা কোন মাধ্যমটি বাছাই ভাল হবে? দোকান বা বাড়ি বেঁচাকেনা করলে ভাল হবে না কি ক্ষতি হবে? কোন জায়গায় বসবাস করা উত্তম হবে। বিয়ে শাদী কোথা থেকে করলে ভাল হবে? ইত্যাদি। যেসব কাজের ব্যাপারে শরীয়ত প্রকাশ্য বিধান দিয়ে দিয়েছে, সেসব কাজে ইস্তেখারা করা যাবে না। যেমন; পাঁচ ওয়াক্ত নামায, ধনী হওয়া সাপেক্ষে যাকাত আদায় করা, রমযান মাসের রোযা রাখা ইত্যাদি নিয়ে ইস্তেখারা করা যাবে না যে, আমি নামায পড়বো কি পড়বো না? যাকাত দিবো কি দিবো না? অনুরূপ মিথ্যা বলা, কারো অধিকার বিনষ্ট করা ইত্যাদি যেসব কাজে শরীয়ত নিষেধ করে দিয়েছে, সেগুলো করবো কি করবো না? বরং এ ধরনের সব কাজে শরীয়তের বিধান মেনে চলা আবশ্যক। তাছাড়া ইস্তেখারার জন্য এটাও শর্ত যে, সেই কাজটি জায়িয হতে হবে। নাজায়িয ব্যবসা ইত্যাদির জন্য ইস্তেখারা করা যাবে না। হাকীমুল উম্মত, মাওলানা মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ ইস্তেখারা সম্পর্কে হাদীস পাকের ব্যাখ্যা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: শর্ত হলো, কাজটি হারামও হতে পারবে না, ফরযও না, ওয়াজিবও না, দৈনন্দিন কাজও না। অতএব, নামায পড়া না পড়া নিয়ে, হজ্ব করা না করা নিয়ে, আহার করা না করা নিয়ে, পানি পান করা না করা নিয়ে কোন ইস্তেখারা করা যাবে না। (মিরাতুল মানাজীহ, ২/৩০১)صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد
কাজটি করার ইচ্ছা দৃঢ় না হওয়াইস্তেখারার আদবের মধ্যে এটাও রয়েছে যে, ইস্তেখারা এমন কাজের সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে, যা করার ব্যাপারে মনের মধ্যে পরিপূর্ণ সিদ্ধান্ত না হওয়া। কেননা যে কোন দিকে যদি মনের টান চলে যায়, তাহলে ইস্তেখারার মাধ্যমে বিশুদ্ধ ফলাফল লাভ করা বড়ই দুরূহ হয়ে যাবে। (ফতহুল বারী, ১২/১৫৫) সদরুশ শরীয়ত, বদরুত তরিকত হযরত আল্লামা মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ আমজাদ আলী আযমী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বাহারে শরীয়ত ১ম খন্ডের ৬৮৩ পৃষ্ঠায় লিখেন: ইস্তেখারার সময় ততক্ষণ পর্যন্ত থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত এক পক্ষের প্রতি নিজের মনের ভাব পূর্ণ ভাবে স্থির হয়ে না যায়। (বাহারে শরীয়ত, ১/৬৮৩)প্রসিদ্ধ মুফাসসির হাকীমুল উম্মত হযরত মুফতী আহমদ ইয়ার খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ লিখেন: আবশ্যক যে, সেই কাজের পুরোপুরি সিদ্ধান্ত না নেওয়া। কেবল মনোভাব সৃষ্টি হওয়া। যেমন; কোন ব্যবসা-বাণিজ্য, বিয়ে শাদী, ঘরের ভিত্তি স্থাপন ইত্যাদির সাধারণ ইচ্ছা সৃষ্টি হওয়া এবং মনে মনে সন্দেহ থাকে যে, এতে কি ভাল হবে, না কি মন্দ হবে। তবেই ইস্তেখারা করবে। (মিরাতুল মানাজীহ, ২/৩০১)ইস্তেখারার উদ্দেশ্য হলো মঙ্গল কামনা করা। তাই ইস্তেখারা করে নেওয়ার পর সেই অনুযায়ী কাজ করা উত্তম। তবে হ্যাঁ! কোন কারণে যদি কাজ করা না হয়, তবু গুনাহগার হবে না।
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّدইস্তেখারার বিভিন্ন পদ্ধতিযেহেতু ইস্তেখারা হলো রব তায়ালার নিকট মঙ্গল কামনা করা কিংবা কারো কাছ থেকে মঙ্গলের জন্য পরামর্শ করারই নাম, তাই বিভিন্ন দোয়ার মাধ্যমে মহান প্রতিপালকের নিকট ইস্তেখারা করা হয়ে থাকে। এর মধ্য থেকে একটি দোয়া নামাযের পরে করা হয়ে থাকে। তাই সেই নামাযকে ইস্তেখারার নামায বলা হয়।
ইস্তেখারার নামাযের পদ্ধতিকেউ যদি কোন কাজ করার ইচ্ছা করে, তবে দুই রাকাত নফল নামায পড়বে। তারপর দোয়া করবে:
اَللّٰهُمَّ اِنِّىْ اَسْتَخِيْرُكَ بِعِلْمِكَ وَاَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ وَاَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيْمِ فَاِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا اَقْدِرُ وَتَعْلَمُ وَلَا اَعْلَمُ وَاَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوْبِ اَللّٰهُمَّ اِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ اَنَّ هٰذَا الْاَمْرَ خَيْرٌ لِّىْ فِىْ دِيْنِىْ وَمَعَاشِىْ وَعَاقِبَةِ اَمْرِىْ اَوْ قَالَ عَاجِلِ اَمْرِىْ وَاٰجِلِهٖ فَاقْدِرْهُ لِىْ وَيَسِّرْهُ لِىْ ثُمَّ بَارِكْ لِىْ فِيْهِ وَاِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ اَنَّ هٰذَا الْاَمْرَ شَرٌّ لِّىْ فِىْ دِيْنِىْ ومَعَاشِىْ وَعَاقِبَةِ اَمْرِىْ اَوْ قَالَ عَاجِلِ اَمْرِىْ وَاٰجِلِهٖ فَاصْرِفْهُ عَنِّىْ وَاصْرِفْنِىْ عَنْهُ وَاقْدِرْلِىَ الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ رَضِّنِىْ بِهٖ
হে আল্লাহ! আমি তোমার জ্ঞানের মাধ্যমে তোমার নিকট মঙ্গল কামনা করছি এবং তোমার ক্ষমতার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রার্থনা করছি এবং তোমার নিকট তোমার মহান করুণা প্রার্থনা করছি, কেননা তুমিই ক্ষমতার একক মালিক। আমি কোন ক্ষমতাই রাখি না। তুমিই সব কিছু জ্ঞাত, আমি কিছুই জানি না। তুমিই গোপন বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখো। হে আল্লাহ! তোমার জানা মতে, এই কাজটিতে (যেই কাজের ইচ্ছা আমি করেছি) যদি আমার দ্বীন, ঈমান, জীবন এবং স্বপক্ষে ফলাফল স্বরূপ দুনিয়া ও আখিরাতে আমার জন্য উত্তম হয়ে থাকে, তবে একে আমার জন্য লিখে দাও এবং আমার জন্য সহজতর করে দাও, এতে আমার জন্য বরকত দাও। হে আল্লাহ! তোমার জ্ঞান অনুযায়ী কাজটি যদি আমার পক্ষে আমার দ্বীন, ঈমান, জীবন এবং স্বপক্ষে ফলাফল স্বরূপ দুনিয়া ও আখিরাতে মন্দ হয়ে থাকে, তবে তুমি তা আমার থেকে এবং আমাকে তা থেকে দূরে সরিয়ে দাও এবং যা আমার জন্য ভাল হয়, সেটিকে আমার ভাগ্যে জুটিয়ে দাও এবং আমাকে এতে করে দাও। (বুখারী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, ১/৩৯৩, হাদীস- ১১৬২ ও রদ্দুল মুহতার, কিতাবুস সালাত, ২/৫৬৯)
আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বলেন: হাদীস শরীফে বর্ণিত এই দোয়াটিতে ‘هٰذَا الْاَمْرَ’ এর স্থলে ইচ্ছা হলে আপনার চাহিদার নাম নিতে পারেন, কিংবা এর পরে। অর্থাৎ আরবি জানা থাকলে এই স্থলে নিজের চাহিদার কথা উল্লেখ করবে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৫৭০) অর্থাৎ আরবি জানা থাকলে এই স্থলে নিজের চাহিদার কথা উল্লেখ করবে। তার মানে ‘ هٰذَا الْاَمْرَ ’ এর স্থলে নিজের চাহিদা উল্লেখ করবে। যেমন; ‘ هذَاا لسَّفر ’ বা ‘ هٰذَاالنِّکَاح ’ কিংবা ‘ هٰذَا التِجَارَة ’ বা ‘هٰذَاالْبَيْعَ ’ বলবে আর যদি আরবি জানা না থাকে, তবে ‘هٰذَا الْاَمْرَ’ বলে মনে মনে নিজের সেই কাজটির খেয়াল করবে যার জন্য ইস্তেখারা করা হচ্ছে।
ইস্তেখারার নামাযে কোন কোন সূরা পাঠ করবেমুস্তাহাব হলো এই দোয়াটির আগে পরে اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ عَزَّوَجَلّ এবং দরূদ শরীফ পাঠ করা। প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পাঠ করবে। কোন কোন মাশায়িখ বলেন: প্রথম রাকাতে
وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَيَخْتَارُ ط مَا كَانَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ ط سُبْحٰنَ اللَّهِ وَتَعٰلٰى عَمَّا يُشْرِكُوْنَ (68) وَرَبُّكَ يَعْلَمُ مَا تُكِنُّ صُدُورُهُمْ وَمَا يُعْلِنُونَ (69)(২০তম পারা, আল কাসাস, ৬৮ও ৬৯)এবং দ্বিতীয় রাকাতে
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُہٗ أَمْرًا أَن يَّكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ط وَمَن يَعْصِ اللهَ وَرَسُولَہٗ فَقَدْ ضَلَّ ضَلٰلًا مُّبِينًا (36)
(২২ তম পারা, আল আহযাব, আয়াত ৩৬) পাঠ করবে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৫৭০)
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد
ইঙ্গিত কীভাবে পাবেকোন কোন মাশায়িখ থেকে বর্ণিত রয়েছে, উক্ত দোয়াটি পাঠ করে ওযু সহকারে কিবলামুখি হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। স্বপ্নে যদি সাদা কিংবা সবুজ কিছু দেখে তবে কাজটি উত্তম হবে। পক্ষান্তরে কালো বা লাল দেখলে খারাপ হবে, কাজটি পরিহার করবে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৫৭০)প্রসিদ্ধ মুফাসসির, হাকীমুল উম্মত, হযরত মুফতী আহমদ ইয়ার খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ এই মাসআলাটির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন: কোন কোন সূফী বলেন: ঘুমাবার সময় যদি দুই রাকাত নামায পড়ে এই দোয়াটি পাঠ করে, তারপর ওযু সহকারে কিবলামুখি হয়ে ঘুমিয়ে যায়, তবে স্বপ্নে যদি সাদা বা সবুজ প্রবাহিত পানি বা আলো দেখে, তবে সাফল্যের নিদর্শন। পক্ষান্তরে যদি কাদাযুক্ত পানি কিংবা অন্ধকার দেখে তবে বিফল ও ব্যর্থ হওয়ার নিদর্শন, এই আমলটি সাত দিন করবে। اِنْ شَاءَ الله عَزَّوَجَلّ এই সময়ের মধ্যে স্বপ্নের মাধ্যমে ইঙ্গিত পেয়ে যাবে। (মিরাতুল মানাজীহ, ২/৩০২)
ইস্তেখারা সাতবার করা উত্তমউত্তম হলো সাতবার ইস্তেখারা করা। একটি হাদীস শরীফে উল্লেখ রয়েছে, “হে আনাস! তুমি যখন কোন কাজের ইচ্ছা করবে, তোমার প্রতিপালকের নিকট তা নিয়ে সাতবার ইস্তেখারা করবে। তারপর তোমার হৃদয়ের মধ্যে দৃষ্টি দিয়ে দেখবে, সেখানকার কী অবস্থা। নিঃসন্দেহে এতে অত্যন্ত মঙ্গল রয়েছে।” (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুস সালাত, ২/৫৭০ ও আমলুল ইয়াউমি ওয়াল লাইলি লিইবনি সুন্নী, ৫৫০ পৃষ্ঠা)
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد
যদি ইঙ্গিত পাওয়া না যায় তবে …?ইস্তেখারা করার পর স্বপ্নে যদি কোন ইঙ্গিত পাওয়া না যায়, তবে নিজের অন্তরের দিকে ধ্যান করতে হবে। অন্তরে যদি কোন পাকা-পোক্ত ইচ্ছা স্থির হয়ে যায়, অথবা কোন কাজ করা বা না করার ব্যাপারে নিজে থেকে মনোভাব পাল্টে যায়, তখন একেই ইস্তেখারার ফল বলে মনে করতে হবে এবং অন্তরের সমাধিক অগ্রাধিকার অনুযায়ী আমল করতে হবে।কেবল দোয়ার মাধ্যমেও ইস্তেখারা করা যেতে পারেআল্লামা ইবনে আবেদীন শামী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ ফতোওয়ায়ে শামীতে লিখেন: وَلَوْ تَعَذَّرَتْ عَلَيْهِ الصَّلٰوةُ اِسْتَخَارَ بِالدُّعَاءِ অর্থাৎ এবং কারো পক্ষে যদি ইস্তেখারার নামায পড়া কষ্টসাধ্য হয়ে যায়, সে যেনো কেবল দোয়ার মাধ্যমেই ইস্তেখারা করে নেয়। (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুস সালাত, মতলব ফি রাকাতাইল ইস্তেখারা, ২/৫৭০)
ইস্তেখারার সংক্ষিপ্ত দোয়াসমূহপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হযরত আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ মিরকাতুল মাফাতীহ কিতাবে লিখেন: কারো যদি কাজের তাড়া থাকে, সে যেনো কেবল এটি বলে নেয়; (১) اَللّٰهُمَّ خِرْلِىْ وَاخْتِرْلِىْ وَاجْعَلْ لِىِ الْخِيَرَةَ অর্থাৎ (আল্লাহ! আমার কাজটি তুমি উত্তম হে করে দাও, আমার জন্য দুইটি কাজের মধ্য থেকে উত্তমটিকে নির্বাচন করে তাতে আমার জন্য মঙ্গল রেখে দাও)। অথবা বলবে; (২) اَللّٰهُمَّ خِرْلِىْ وَاخْتِرْلِىْ وَلَا تَكِلْنِىْ اِلٰى اِخْتِيَارِىْ অর্থাৎ (হে আল্লাহ! আমার কাজটি তুমি উত্তম করে দাও, আমার জন্য দুইটি কাজের মধ্য থেকে উত্তমটিকে নির্বাচন করে দাও আর আমাকে আমার পছন্দের উপর ছেড়ে দিও না)। (মিরকাত মাফাতিহ, কিতাবুস সালাত, বাবুত তাতউয়ি, ৩/৪০৬)
বুযুর্গানে দ্বীনদের رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِمْ পক্ষ থেকে ইস্তেখারা করার আরো কতিপয় পদ্ধতী ও ওযিফা বর্ণিত রয়েছে, যেমন; তাসবীহর মাধ্যমে ইস্তেখারা করা, যা সংক্ষিপ্ত সময়ে সম্পন্ন হয়ে যায়।
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد
ইস্তেখারা করার পরও যদি ক্ষতির শিকার হতে হয়? অনেক সময় মানুষ আল্লাহ তায়ালার নিকট ইস্তেখারা করে যে, তার জন্য যে কাজটিতে ভাল হবে, সেটি যেনো হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সেই কাজটি দান করেন, যা তার পক্ষে উত্তম। কিন্তু বাহ্যিক দৃষ্টিতে কাজটি সম্পর্কে সে বুঝতে পারে না, তখন তার মনের মধ্যে এমন একটি ভাব আসে যে, আমি তো আল্লাহ তায়ালার নিকট সেই কাজটিই চেয়েছিলাম, যা আমার পক্ষে উত্তম হয়, কিন্তু যে কাজটির ইঙ্গিত পেলাম, তা তো উত্তম বলে মনে হচ্ছে না। এই কাজটিতে আমার জন্য ক্ষতি আর দুঃখই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু কিছু দিনের ব্যবধানে সব ধরনের পরিণতি যখন চোখের সামনে উদ্ভাসিত হতে থাকে, তখন সে বুঝতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য যে কাজটি নির্বাচন করেছিলেন, বাস্তবে সেটিই তার জন্য উত্তম। হযরত সায়্যিদুনা মাকহূল আযদী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বর্ণনা করেন: আমি হযরত সায়্যিদুনা আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمَا কে বলতে শুনেছি: মানুষ আল্লাহ তায়ালার নিকট ইস্তেখারা করে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য কোন একটি কাজ পছন্দ করেন, পরে লোকটি আপন প্রতিপালকের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু লোকটি যখন তার ফলাফলের দিকে দৃষ্টিপাত করে, তখন বুঝতে পারে যে, এই কাজটিই তার জন্য উত্তম। (কিতাবুর যুহদ লি ইবনি মোবারক, মা রওয়াহু নাঈম বিন হাম্মাদ, বাবুন ফির রযা বিল কযা, ৩২ পৃষ্ঠা, হাদীস- ১২৮)এর একটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন, কোন শিশু মায়ের সামনে জ্বরে ছটফট করছে, সে বলছে: আমি এটি খাবো, সেটি খাবো। মা-বাবা জানে যে, এই সময়ে সেই বস্তু তার জন্য ক্ষতিকর, তাই তারা তাকে সেই বস্তু খেতে দেয়না বরং তিক্ত ঔষধই খেতে দেয়, সন্তান কিন্তু তার জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে এটা মনে করে যে, তার মা-বাবা তার প্রতি অত্যাচার করেছে। আমি যা চেয়েছিলাম, তা আমাকে দেওয়া হয়নি, তার পরিবর্তে আমাকে তিক্ত ঔষধ খাইয়েছে। শিশুটি নিজের জন্য তিক্ত ঔষধকে উত্তম বলে মনে করছে না, কিন্তু বড় হওয়ার পর শিশুটির যখন জ্ঞান-বুদ্ধি হবে, তখন সে বুঝতে পারবে যে, সে তো মৃত্যুই চেয়েছিলো। অথচ তার মা-বাবা তার জন্য সুস্থ জীবনের পথ খুঁজছিলো। আমাদের মহান প্রতিপালক তো আপন বান্দাদের জন্য তাদের মা-বাবার চাইতেও অতুলনীয় দয়াময়। তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁর মুসলমান বান্দাকে সেই জিনিসটিই দান করেন, যা ফলাফলের দিক থেকে তার জন্য উত্তম হয়। কখনো কখনো সেটি যে উত্তম, তা দুনিয়াতেও বুঝে আসে আর কতগুলো বুঝা যাবে আখিরাতে।
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد এই রিসালার বাকী লিখাগুলো পড়ুন এখানে——–লিখাটি আমীরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা “মুহাম্মদ ইলয়াস আত্তার” কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত ৯৪ পৃষ্ঠা সম্বলিত “অশুভ প্রথা” নামক রিসালার ২৯-৩৬ নং পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই রিসালাটি অবশ্যই সংগ্রহে রাখুন। অন্যকে উপহার দিন। যারা মোবাইলে (পিডিএফ) রিসালাটি পড়তে চান তারা ফ্রি ডাউনলোড করুন ।ইসলামীক বাংলা বইয়ের লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুনমাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন

মুহাররম ও আশুরার রোযার ফযীলত

আশুরায় সংঘঠিত ৯টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা﴾১﴿ আশুরার দিন (অর্থাৎ ১০ মুহাররামুল হারাম) হযরত সায়্যিদুনা নুহ عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام এর নৌকা জুদী পাহাড়ে ভিড়ে। ﴾২﴿ এই দিনেই হযরত সায়্যিদুনা আদম সফিয়্যুল্লাহ عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام এর অনিচ্ছাকৃত ভূলের তাওবা কবুল করা হয়েছে। ﴾৩﴿ এই দিনেই হযরত ইউনুস عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام এর সম্প্রদায়ের তাওবা কবুল করা হয়। ﴾৪﴿ এই দিনেই হযরত সায়্যিদুনা ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام জন্ম গ্রহণ করেন। ﴾৫﴿ এই দিনেই হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রুহুল্লাহ عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام কে সৃষ্টি করা হয়।(আল ফিরদাউস, ১ম খন্ড, ২২৩ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ৮৫৬।) ﴾৬﴿ এই দিনেই হযরত সায়্যিদুনা মূসা কলিমুল্লাহ عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام ও তারঁ সম্প্রদায়ের মুক্তি অর্জিত হয় এবং ফিরআউন নিজ গোত্রসহ ডুবে যায়।(বুখারী, ২য় খন্ড, ৪৩৮ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ৩৩৯৭-৩৩৯৮।) ﴾৭﴿ এই দিন সায়্যিদুনা ইউছুফ عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام এর কয়েদখানা থেকে মুক্তি অর্জিত হয়। ﴾৮﴿ এই দিনেই হযরত সায়্যিদুনা ইউনুস عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام কে মাছের পেট থেকে বের করা হয়।(ফয়যুল কদীর, ৫ম খন্ড, ২৮৮ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ৭০৭৫।) ﴾৯﴿ সায়্যিদুনা ইমাম হুসাইন رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ কে তাঁর শাহজাদা ও সঙ্গী সাথী সহ তিনদিন ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত রাখার পর এই আশুরার দিনেই কারবালার বুকে অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে শহীদ করা হয়।
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد
মুহাররমুল হারাম ও আশুরার রোযার ৬টি ফযীলত﴾১﴿ হুযুরে আকরাম, নূরে মুজাসসাম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: রমযানের রোযার পর মুহাররমের রোযা উত্তম এবং ফরযের পর উত্তম নামায হলো ‘সালাতুল লায়ল’ (অর্থাৎ রাতের নফল নামায)।” (মুসলিম, ৫৯১ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ১১৬৩)
﴾২﴿ প্রিয় আক্বা, উভয় জাহানের দাতা, রাসুলুল্লাহ صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: “মুহাররমের প্রতিদিনের রোযা এক মাসের রোযার সমান।” (মু’জামুস সগীর, ২য় খন্ড, ৭১ পৃষ্ঠা)
মূসা عَلَيْهِ السَّلَام দিবস﴾৩﴿ হযরত সায়্যিদুনা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمَا বলেন: রাসূলুল্লাহ صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم যখন মদীনা মুনাওয়ারায় زَادَهَا اللهُ شَرَفًا وَّ تَعْظِيْمًا তাশরীফ আনলেন, ইহুদীদেরকে আশুরার দিন রোযারত অবস্থায় দেখে ইরশাদ করলেন: এটা কোন দিন যে, তোমরা রোযা রাখছো? আরয করলো: এটি মহত্বপূর্ণ দিন, এতে মূসা عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام এবং তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহ তায়ালা মুক্তি দিয়েছেন আর ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং মূসা عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এ দিনে রোযা রাখেন, তাই আমরাও রোযা রাখছি। ইরশাদ করলেন: মূসা عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام এর অনুসরন করার ক্ষেত্রে তোমাদের তুলনায় আমরা বেশি হকদার এবং বেশি নিকটতর। তখন হুযুর صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم নিজেও রোযা রাখলেন এবং এর নির্দেশও দিলেন। (মুসলিম, ৫৭২ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ১১৩০)
প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! এ হাদীসে পাক থেকে জানা গেলো যে, যেদিন আল্লাহ তায়ালা কোন বিশেষ নেয়ামাত দান করেছেন, তার স্মৃতি বহন করা সঠিক ও পছন্দনীয়, কেননা এর মাধ্যমে ঐ মহান নেয়ামতের স্মরণ সতেজ হবে এবং এর কৃতজ্ঞতা আদায় করার উপায়ও হবে, স্বয়ং কোরআনে আযীমে ইরশাদ করেন:وَذَكِّرْهُمْ بِاَيّٰمِ الله
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: এবং তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার দিন স্মরণ করিয়ে দাও! (পারা- ১৩, সূরা- ইব্রাহীম, আয়াত- ৫)
সদরুল আফাযিল হযরত আল্লামা মাওলানা সায়্যিদ মুহাম্মদ নাঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন যে, “بِاَيّٰمِ الله ” দ্বারা ঐ দিন উদ্দেশ্য, যাতে আল্লাহ তায়ালা আপন বান্দাদেরকে পুরস্কৃত করেছেন, যেমন; বনী ইস্রাইলের জন্য ‘মান্না ও সালওয়া’ অবতরণের দিন, হযরত সায়্যিদুনা মূসা عَلٰی نَبِیِّنَاوَعَلَیْہِ الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام এর জন্য নদীতে রাস্তা বানানোর দিন। এসব দিনের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় নেয়ামতের দিন হচ্ছে, সায়্যিদে আলম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর বিলাদত শরীফ (পৃথিবীতে শুভাগমনের দিন) ও মিরাজ শরীফের দিনে তাঁর স্মৃতি ধারণ করাও এ আয়াতের বিধানভূক্ত। (খাযায়িনুল ইরফান থেকে সংক্ষেপিত, ৪৭৯ পৃষ্ঠা)
ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ ও দা’ওয়াতে ইসলামীপ্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! সুলতানে মদীনা মুনাওয়ারা, শাহানশাহে মক্কা মুকাররমা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর বিলাদত শরীফের দিনের চেয়ে মহান কোন দিনটি “পুরস্কারের দিন” হবে? নিশ্চয় সকল নেয়ামত তাঁরই সদকায় অর্জিত এবং তাঁর বিলাদতের দিন তো ঈদেরও ঈদ। اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ عَزَّوَجَلّ আশিকানে রাসূলের মাদানী সংগঠন দা’ওয়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে পৃথিবীর অগণিত স্থানে প্রতি বছর ঈদে মিলাদুন্নবী صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم জাঁকজমক সহকারে উদযাপন করা হয়। রবিউল আউয়াল শরীফের ১২তম রাতে আজিমুশ্মান ইজতিমায়ে মিলাদ এর আয়োজন করা হয় এবং বিশেষকরে আমার সুধারণা মতে ঐ রাতে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় “ইজতিমায়ে মিলাদ” বাবুল মদীনা করাচীতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে আর মাদানী চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ঈদে মিলাদের দিন “মারহাবা ইয়া মুস্তফা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم” শ্লোগানে মুখরিত করে অসংখ্য জুলুসে মিলাদ বের করা হয়, যাতে লক্ষ লক্ষ আশিকানে রাসূল অংশগ্রহণ করে থাকে।
ঈদে মিলাদুন্নবী তো ঈদ কি ভি ঈদ হে,বিল ইয়াকিঁ হে ঈদে ঈদা ঈদে মিলাদুন্নবী। (ওয়াসায়িলে বখশীশ, ৩৮০ পৃষ্ঠা)
আশুরার রোযা﴾৪﴿ হযরত সায়্যিদুনা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمَا বলেন: “আমি সুলতানে দোজাহান صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم কে কোন দিনের রোযাকে অন্য দিনের উপর প্রাধান্য দিয়ে উৎসাহ দিতে দেখিনি; কিন্তু আশুরার দিনের ও রমযান মাসের রোযা ব্যতীত।” (বুখারী, ১ম খন্ড, ৬৫৭ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ২০০৬)
ইহুদীদের বিরোধীতা করো﴾৫﴿ নবীয়ে রহমত, শফীয়ে উম্মত صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: আশুরার দিনের রোযা রাখো আর এতে ইহুদীদের বিরোধীতা করো, এর পূর্বে বা পরেও এক দিনের রোযা রাখো। (মুসনাদে ইমাম আহমদ, ১ম খন্ড, ৫১৮ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ২১৫৪) আশুরার রোযা যখনই রাখবে, তখন এর সাথে ৯ কিংবা ১১ মুহাররামুল হারামের রোযাও রেখে নেয়া উত্তম।
﴾৬﴿ হযরত সায়্যিদুনা আবু কাতাদা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ থেকে বর্ণিত; নবী করীম, রউফুর রহীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর ক্ষমামূলক ইরশাদ হচ্ছে: আমার আল্লাহ তায়ালার প্রতি ধারণা রয়েছে যে, আশুরার রোযা এক বছর পূর্বের গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। (মুসলিম, ৫৯০ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ১১৬২)
সারা বছর ঘরে বরকতদা’ওয়াতে ইসলামীর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মাকতাবাতুল মদীনা কর্তৃক প্রকাশিত ১৬৬ পৃষ্ঠা সম্বলিত কিতাব “ইসলামী জিন্দেগী” এর ১৩১ পৃষ্ঠায় প্রসিদ্ধ মুফাসসীর, হাকীমুল উম্মত হযরত মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ বলেন: মুহাররমের ৯ ও ১০ তারিখ রোযা রাখলে অনেক সাওয়াব পাওয়া যাবে, সন্তান সন্তুতির জন্য ১০ মুহাররম ভাল ভাল খাবার রানড়বা করুন তবে اِنْ شَاءَ الله عَزَّوَجَلّ সারা বছর ঘরে বরকত থাকবে। উত্তম হচ্ছে যে, খিচুড়ী রান্না করে হযরত শহীদে কারবালা সায়্যিদুনা ইমাম হুসাইন رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ এর নামে ফাতিহা করা খুবই উপকারী, কার্যকর ও পরীক্ষিত। (ইসলামী জিন্দেগী, ১৩১ পৃষ্ঠা)
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد——–লিখাটি আমীরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা “মুহাম্মদ ইলয়াস আত্তার” কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত ৫৪৪ পৃষ্ঠা সম্বলিত “ফয়যানে রমযান” নামক কিতাবের ৩৮২-৩৮৬ নং পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই কিতাবটি অবশ্যই সংগ্রহে রাখুন। অন্যকে উপহার দিন। যারা মোবাইলে (পিডিএফ) কিতাবটি পড়তে চান তারা ফ্রি ডাউনলোড করুন ।ইসলামীক বাংলা বইয়ের লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুনমাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন

অশুভ প্রথা বা কুসংস্কারে বিশ্বাস (২)

কুসংস্কারের কোন বাস্তবতা নেইবুখারী শরীফে হযরত সায়্যিদুনা আবু হুরায়রা رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ থেকে বণির্ত , মদীনার তাজেদার, রাসূলদের সর্দার صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: সংক্রমণ বলতে কিছু নাই, না আছে কোন অশুভ ফাল তথা অশুভ ইঙ্গিত, আর নাই পেঁচা-ও, না শূন্য (খালি) ও কুষ্ঠ থেকে পালাবে, যেমনিভাবে বাঘ দেখে পালাও। (বুখারী, কিতাবুত তিব্ব, ৪/২৪, হাদীস- ৫৭০৭ ও ওমদাতুল কারী, কিতাবুত তিব্ব, ১৪/৬৯২, হাদীস- ৫৭০৭)বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকারী মুফতী মুহাম্মদ শরীফুল হক আমজাদী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِহাদীস শরীফটির ব্যাখ্যায় বলেন: এই হাদীস শরীফটি থেকে প্রাপ্ত কিছু মাদানী ফুল উপস্থাপন করা হলো,
۞ জাহেলীয়তের যুগে মানুষের বিশ্বাস ছিলো যে, এমন কতগুলো রোগ রয়েছে যা অন্যের প্রতি সংক্রমিত হয়। যেমন: কুষ্ঠ, খোস পাঁচড়া, প্লেগ ইত্যাদি। হুযুরে পাক صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم সেই বিশ্বাসকে নিশ্চিহ্ন করে দিলেন এবং নিষেধ করে দিলেন। একজন গ্রাম্য লোক এসে উপস্থিত হলো, সে বললো : আমার উটগুলো পরিস্কার- পরিচ্ছন্ন ও উন্নত হয়ে থাকে। তা থেকে একটি খোস-পাচঁড়া বিশিষ্ট উট এসে সবাইকে খোস-পাচঁড়া বিশিষ্ট করে দিচ্ছে। হুযুর صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করলেন: প্রথমটিকে খোস-পাঁচড়া কে বানিয়েছিলো? সে বললো: আল্লাহ তায়ালা। ইরশাদ করলেন: এভাবে বাকিগুলোকেও আল্লাহ তায়ালাই খোস-পাঁচড়া বিশিষ্ট বানিয়েছেন।۞ আরবদের অভ্যাস ছিলো, তারা যখন কোন সফরে গমন করতো, তখন যদি কোন পাখি তাদের ডান পাশ দিয়ে উড়তো, তখন সেই সফরকে তারা মঙ্গলময় মনে করতো আর যদি বাম দিক দিয়ে উড়তো তবে তারা তা অমঙ্গল মনে করতো। এ ধরনের আরো অনেক সন্দেহ তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিলো। যা বর্তমানে আমাদের সমাজেও প্রচলিত রয়েছে। হুযুর صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ঐসব সন্দেহকে দূরীভূত করে দেন।
۞ ‘হাম্মা’ একটি পাখির নাম, কারো মতে এটি হলো পেঁচা। জাহেলীয়তের যুগে মানুষের বিশ্বাস ছিলো যে, এই পাখিটি যদি কোন ঘরে বসে, তাহলে সেই ঘরে কোন না কোন বিপদ অবতীর্ণ হবে। বর্তমানেও মুর্খদের নিকট প্রসিদ্ধ রয়েছে যে, যে ঘরে পেঁচা ডাকে কিংবা যে ঘরের ছাদে পেঁচা ডাকে সেই ঘরে কোন বিপদ আসবে। আরেক উক্তি মতে, জাহেলীয়তের যুগে মানুষের বিশ্বাস ছিলো যে, মৃতদের হাঁড়গুলো ‘পেঁচা’ হয়ে উড়ে। এক উক্তি মতে, যেই মৃতের কিসাস (প্রতিশোধ) নেওয়া হয় না সে ‘পেঁচা’ হয়ে যায় আর সে বলতে থাকে, আমাকে পান করাও, আমাকে পান করাও। যখন তার কিসাস (প্রতিশোধ) নিয়ে নেওয়া হয়, তখন সে উড়ে যায়। এসব সন্দেহকে প্রিয় নবী صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم দূর করে দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন: এসব কিছুই না। (নুযহাতুল কারী, ৫/ ৫০২)
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّدঘর পরিবর্তনে কি বরকত শেষ হয়ে যায়?বণির্ত আছে, জনৈক ব্যক্তি নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর দরবারে এসে আরয করলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ !صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم আমরা এক ঘরে বসবাস করতাম, পরিবার পরিজন ও ধন-সম্পদ নিয়ে সেখানে আমি খুব ভালই ছিলাম, পরে আমি ঘরটি পরিবর্তন করে ফেললাম, এতে আমার ধন-সম্পদ ও সদস্য সংখ্যা কমে গেলো। তখন নবী করীমصَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: রাখো! এরূপ বলা খারাপ। (আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দীন লিল মাওয়ারদী, ২৭৬ পৃষ্ঠা)صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد
কুসংস্কার মানাটা আমার সন্দেহ ছিলোতাফসীরে রূহুল বয়ানে রয়েছে; জনৈক ব্যক্তি বলছে: একবার আমি এতোই অভাব-অনটনে পড়ে গেলাম যে, ক্ষুধা নিবারণের জন্য আমাকে মাটি খেতে হয়েছিলো। তারপরও ক্ষুধার জ্বালা মিটাতে পারিনি, আমি মনে মনে ভাবলাম, এমন কোন ব্যক্তি যদি পেয়ে যাই, যে আমাকে খাবার খাওয়াবে। খাবারের সন্ধানে আমি ইরানের আহওয়ায শহরের দিকে রওয়ানা দিলাম, অথচ শহরটি সম্বন্ধে আমার কোন ধারণাই ছিলোনা। আমি যখন নদীর নিকট গিয়ে পৌঁছলাম, দেখলাম সেখানে কোন নৌকা নাই। এটিকে আমি অশুভ লক্ষণ হিসাবে ধরে নিলাম, তারপর আমি একটি নৌকা দেখতে পেলাম, কিন্তু তাতে ছিদ্র ছিলো। এটি আমার দ্বিতীয় অশুভ লক্ষণ মনে হলো, মাঝির নাম জিজ্ঞাসা করলাম, সে তার নাম বললো ‘দীওযাদাহ’ (আরবিতে একে বলা হয় শয়তান)। এটা ছিলো আমার তৃতীয় অশুভ লক্ষণ। যাই হোক, আমি নৌকায় আরোহন করলাম, নৌকাটি যখন নদীর ওপারে গিয়ে পৌঁছলো, আমি তখন ডাক দিয়ে বললাম: হে কুলি! আমার মালামালগুলো উঠিয়ে নাও। তখন আমার নিকট একটি পুরানো তোষক ও কিছু প্রয়োজনীয় মালামাল ছিলো। আমার ডাকে যে মজুরটি এলো, সে ছিল কানা, এটিকে আমি চতুর্থ অশুভ লক্ষণ বলে মনে করলাম। আমার ধারণা হলো, এখান থেকে চলে যাওয়াই আমার জন্য শুভ হবে। তারপরও নিজের প্রয়োজনের কথা ভেবে ফিরে যাওয়ার মনোভাব ত্যাগ করলাম, আমি যখন মুসাফির খানায় গিয়ে পৌঁছলাম, তখনো এই কথাই ভাবছিলাম যে, করার কী আছে। এমন সময় কেউ এসে দরজায় করাঘাত করলো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম: কে? উত্তরে সে বললো: আমি আপনার সাক্ষাতে এসেছি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম: তুমি কি আমাকে চিনো? সে বললো: হ্যাঁ। আমি মনে মনে ভেবেছি যে, এ হয় শত্রু হবে, অন্যথায় বাদশার পক্ষ থেকে দূত। আমি কিছুক্ষণ ভাবার পর দরজা খুলে দিলাম। লোকটি বললো: অমুক ব্যক্তি আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। তিনি বার্তা পাঠিয়েছেন যে, আপনার সাথে আমার যদিও মতবৈষম্য রয়েছে, তবু আচার-আরচণগত হক তো অবশ্যই পালন করতে হবে, আমি আপনার অবস্থাদি শুনেছি, তাই আপনার প্রয়োজনাদি মিটানো আমার কর্তব্য, আপনি যদি এক দুই মাস আমার এখানে থাকেন, তবে আপনার সারা জীবনের জন্য দেখা শোনার একটি ব্যবস্থা হয়ে যাবে আর আপনি যদি এখান থেকে চলে যেতে চান, তাহলে এই ত্রিশটি দীনার নিন, প্রয়োজনে ব্যয় করবেন আর আপনি চলে যান, আমি আপনার সমস্যা বুঝতে পারছি। লোকটি বলল: আমি বিগত জীবনে কখনো ৩০ দীনারের মালিক হইনি। তাছাড়া আমি এও বুঝতে পেরেছি যে, কুসংস্কারের বাস্তবতা বলতে কিছুই নাই। (রূহুল বয়ান, ১/৩০৪)
তীর নিক্ষেপ করে ভাগ্য নির্ণয় করিওনা৬ষ্ট পারার সূরা মায়িদার ৯০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ اٰمَنُوْا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطٰنِ فَاجْتَنِبُوْهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ণায়ক তীর অপবিত্রই, শয়তানী কাজ। সুতরাং তা থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা সাফল্য লাভ করো। (৬ষ্ট পারা, সূরা মায়িদা, আয়াত ৯০)
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد
তীর নিক্ষেপ করে ভাগ্য নির্ণয় করা গুনাহের কাজ৬ষ্ট পারায় সূরা মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে:
وَأَن تَسْتَقْسِمُوْا بِالْأَزْلَامِ ۚ ذَٰلِكُمْ فِسْقٌ
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা, এটি পাপ কাজ। (৬ষ্ট পারা, সূরা মায়িদা, আয়াত ৩)সদরুল আফাজিল হযরত আল্লামা মাওলানা সায়্যিদ মুহাম্মদ নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ লিখেন: জাহেলীয়তের যুগে লোকদের যখন সফর, যুদ্ধ, ব্যবসা বা বিাবাহ-শাদি ইত্যাদি সামনে আসতো, তখন তারা তিনটি তীর নিক্ষেপ করে ভবিষ্যত বের করতো, অতঃপর সেই অনুযায়ী আমল করতো। একে তারা আল্লাহ তায়ালার আদেশ বলে মনে করতো। ইসলামে এসব কিছু নিষেধ করা হয়েছে। (খাযায়িনুল ইরফান, ২০৬ পৃষ্ঠা) বরীকায়ে মাহমুদিয়া শরহে তরীকায়ে মুহাম্মদিয়ায় উল্লেখ রয়েছে: তিনটি তীরের একটিতে লেখা থাকতো “ اَمَرَنِىْ رَبِّى (আমার প্রতিপালক আমাকে নিদের্শ দিয়েছেন)”, দ্বিতীয়টিতে লেখা থাকতো “نَهَانِى رَبِّى (আমার প্রতিপালক আমাকে নিষেধ করেছেন)” এবং তৃতীয়টিতে কিছুই লেখা থাকতো না। যদি প্রথম তীরটি উঠতো, কাজটি করতো, যদি দ্বিতীয়টি উঠতো, কাজটি করা থেকে বিরত থাকতো আর যদি তৃতীয় তীরটি উঠতো, দ্বিতীয়বার ভাগ্য নিণর্য় করতে। এরূপ ভাগ্য নির্ণয় এবং এধরনের অপরাপর জিনিস ব্যবহার করা জায়িয নাই। (বরীকাতে মাহমুদিয়া শরহে তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া, ২/৩৮৫)
কোরআনী ফাল তথা ইঙ্গিত বের করা না-জায়িয অনেকে কোরআন মজীদের যে কোন পৃষ্ঠা খুলে সেই পৃষ্ঠার সর্বপ্রথম আয়াতের অনুবাদ থেকে নিজের যে কোন কাজে মনের মত করে মর্মা র্থ নিয়ে ফাল তথা ইঙ্গিত বের করে থাকে, এ ধরনের ইঙ্গিত বের করা না-জায়িয। হাদীকা নদিয়ায় উল্লেখ রয়েছে: কোরআনী ফাল, ফালে দা’নিয়াল এবং অনুরূপ অন্যান্য ফাল যা বর্তমান যুগে প্রচলিত, সেগুলো নেক ফালের পর্যায়ভূক্ত নয় বরং তীর নিক্ষেপ করে ফাল বের করার যেই বিধান, এগুলোরও একই বিধান। সুতরাং এরূপ করাও না জায়িয। (হাদীকায়ে নদিয়া শরহে তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া, ২/২৬) পক্ষান্তরে বরীকায়ে মাহমুদিয়াতে উল্লেখ আছে: পবিত্র কোরআন থেকে অশুভ ফাল তথা অশুভ ইঙ্গিত গ্রহণ করা মাকরূহে তাহরীমি। (বরীকায়ে মাহমুদিয়া শরহে তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া, ২/৩৮৬)
একটি শিক্ষামূলক ঘটনা
একদিন ওয়ালিদ বিন ইয়াজিদ বিন আব্দুল মালিক কোরআন থেকে ফাল তথা ইঙ্গিত বের করলো। কোরআন পাক খোলার সাথে সাথে এই আয়াতটি এলো: وَاسْتَفْتَحُوا وَخَابَ كُلُّ جَبَّارٍ عَنِيدٍ
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: এবং তারা মীমাংসা চেয়েছে এবং প্রত্যেক অবাধ্য, হঠকারী ব্যর্থ মনোরথ হয়েছে । (পারা ১৩, সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ১৫)তখন ওয়ালিদ বিন ইয়াজিদ পবিত্র কোরআনটি (مَعَاذَ الله عَزَّوَجَل) শহীদ করে দিলো এবং এই পঙতিটি পাঠ করলো: যার অনুবাদ: তুমি কি সকল অবাধ্য আর গোঁয়ারকে হুমকি দিচ্ছো (مَعَاذَ الله عَزَّوَجَل), হ্যাঁ আমি হলাম সেই অবাধ্য আর গোঁয়ার। তুমি যখন কিয়ামতের দিন তোমার প্রতিপালকের নিকট উপস্থিত হবে, তখন বলে দিও, ওয়ালিদ আমাকে শহীদ করে দিয়েছিলো।এই ঘটনাটির কিছুদিনের মধ্যেই কেউ ওয়ালিদকে অত্যন্ত নিমর্ম ভাবে হত্যা করেছিলো। তার মস্তকটিকে প্রথমে তারই ঘরের ছাদে এবং পরে নগরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছিলো। (আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন, ২৭৬ পৃষ্ঠা)
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد
তাঁরা কখনো ফাল গ্রহণের জন্য তীর নিক্ষেপ করেননিহযরত সায়্যিদুনা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُمَا থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم যখন বাইতুল্লায় ছবিসমূহ দেখতে পান, তখন প্রবেশ করেননি। যতক্ষণ পর্যন্ত না নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর নির্দেশে সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم হযরত সায়্যিদুনা ইব্রাহীম ও হযরত ইসমাঈল عَلَيْهِمَا الصَّلوٰۃُ وَالسَّلام এর ছবি দেখতে পান যে, তাঁদের হাতে ফাল গ্রহনের তীর ছিলো। তখন হুযুর صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: আল্লাহ তায়ালা ঐসব লোকদের (অর্থাৎ ছবি নির্মাতাদের) ধ্বংস করুক। আল্লাহর শপথ! এই দু’জন নবী কখনো তীরের মাধ্যমে ভাগ্য নির্ণয় করেননি। (বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, ২/ ৪২১, হাদীস- ৩৩৫২)
ফাল গ্রহণের তীর কিরূপ?বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকারী মুফতী মুহাম্মদ শরীফুল হক আমজাদী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِহাদীস শরীফটি সম্পর্কে লিখেন: মুশরিকরা ফাল গ্রহণের জন্য সাতটি তীর বানিয়ে নিতো। একটিতে লিখা থাকতো হ্যাঁ (نَعَمْ ), দ্বিতীয়টিতে না (لَا), তৃতীয়টিতে তন্মধ্য হতে ( مِنْهُمْ ), চতুর্থটিতে তন্মধ্য হতে নয় ( مِنْ غَيْرِهِم ), পঞ্চমটিতে সম্পৃক্ত হওয়া (مُلْصَق), ষষ্ঠটিতে দিয়্যাত ( اَلْعَقْل ), ১. দিয়্যাত ঐ সম্পদকে বলে, যা প্রাণের পরিবর্তে আবশ্যক হয়। (বাহারে শরীয়ত, ৩/৮৩০) সপ্তমটিতে অবশিষ্ট দিয়্যাত ( فَضْلُ الْعَقْل)। এসব তীর কাবার খাদেমের কাছে থাকতো। মুশরিকরা যখন কোথাও যাওয়ার কিংবা বিবাহ করবার ইচ্ছা করতো, কিংবা তারা যখন অন্য কোন প্রয়োজনের শিকার হতো, তখন খাদেম তীর নিক্ষেপ করতো। যদি ‘হাঁ’ (نَعَمْ ) উঠতো, তবে কাজটি করতো। যদি ‘না’ (َﻻ ) উঠতো, তবে কাজটি করতো না আর যদি কারো বংশ নিয়ে সন্দেহ হতো, তাহলে সেই তিনটি তীর নিক্ষেপ করতো, যেগুলোতে লেখা থাকতো ‘তন্মধ্য হতে’ (مِنْهُمْ ), ‘তন্মধ্য হতে নয়’ ( مِنْ غَيْرِهِم) এবং ‘সম্পৃক্ত হওয়া’ (مُلْصَق )। যদি (مِنْهُمْ ) ‘তন্মধ্য হতে’ উঠতো, তবে বলতো: তার বংশ সঠিক আছে আর যদি লটারীতে ( مِنْ غَيْرِهِم) ‘তন্মধ্য হতে নয়’ উঠতো, তখন বলতো: সে এই বংশের লোক নয়, সে এই বংশের মিত্র। আর যদি ( مُلْصَق ) ‘সম্পৃক্ত হওয়া’ উঠতো, তখন বলতো: সে এই বংশের সাথে না সম্পৃক্ত, না এর মিত্র। আর কেউ যদি অপরাধ করতে এবং মতানৈক্য সৃষ্টি হতো যে, এর দিয়্যাত তথা ক্ষতিপূরণ কার উপর হবে। তখন অবশিষ্ট দু’টি তীর ব্যবহার করতো। একটি দলকে নির্দিষ্ট করে তীর নিক্ষেপ করতো। যদি তাদের নামে (الْعَقْل) দিয়্যাত উঠতো, তখন সেই দলটির উপর ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা আবশ্যিক করে দিতো এবং দ্বিতীয় দলকে নিরপরাধ বলে ছেড়ে দেওয়া হতো। তাদের পক্ষ থেকে যদি ক্ষতিপূরণের সম্পূর্ণ অর্থ আদায় না হতো এবং মতবৈষম্য হতো যে, কে আদায় করবে? তখন (فَضْلُ الْعَقْل) অবশিষ্ট দিয়্যাত নামের তীরটি নিক্ষেপ করা হতো। যাদের নামে পড়তো, তারা অবশিষ্ট ক্ষতিপূরণ আদায় করতো। এর ব্যাখ্যায় আরো কিছু বর্ণনা রয়েছে। তবে পরিচিতির জন্য আমি কেবল একটি আলোচনা করেছি। এটি ছিলো সন্দেহবাতিকতা। এ ছিলো অজ্ঞতা বরং বংশ এবং ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে অত্যাচার ছিলো। তাই ইসলাম সেটিকে কঠোরভাবে নিষেধ ঘোষণা দিয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:
وَاَنْ تَسْتَقْسِمُوْا بَالْاَزْلَامِ
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে, তীরের মাধ্যমে ভাগ্যলিপি নির্ণয় করা। (৬ষ্ট পারা, আল মায়িদা, আয়াত ৩) (নুযহাতুল কারী, ৩/১০৫)
গণকের ব্যাপারে আ’লা হযরতের ফতোয়াআমার আক্বা আ’লা হযরত ইমামে আহলে সুন্নাত মুজাদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত মাওলানা শাহ ইমাম আহমদ রযা খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ এর নিকট এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, যেই ব্যক্তি গণনা করে এবং লোকদের বলে: ‘তোমার কাজ হয়ে যাবে, অথবা হবে না কিংবা অমুক কাজটি তোমার জন্য ভাল হবে কিংবা খারাপ হবে, লাভ হবে, কিংবা লোকসান হবে? তখন আ’লা হযরত رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ উত্তর দিলেন: ১। তার এই ধরনের কথাগুলো যদি সে অকাট্য ও একান্ত নিভর্র যোগ্য বলে দাবী রেখে বলে থাকে, তবে সে তো মুসলমানই নয়। এগুলোকে যারা সত্য বলে বিশ্বাস করে তাদের ব্যাপারে সহীহ হাদীস শরীফে রয়েছে: فَقَدْ كَفَرَ بِمَا نُزِّلَ عَلٰى مُحَمَّد অর্থাৎ সে ওসব কিছুকে অস্বীকার করলো, যা মুহাম্মদصَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে (তিরমিযী, কিতাবুত তাহারাত, বাবু মা’জা ফি কারাহিয়াতি ইতইয়ানি হাসায়িস, ১/১৮৫, হাদীস নং-১৩৫।) এবং ২। যদি সে অকাট্য রূপে না বলে থাকে, তবুও ফাল তথা ইঙ্গিত দেখার যে রীতিটি চালু রয়েছে, তা গুনাহ থেকে পৃথক নয়। (ফতোয়ায়ে রযবীয়া, ২৩/ ১০০)
গণকের পারিশ্রমিক নেওয়ার বিধানপ্রসিদ্ধ মুফাসসির, হাকীমুল উম্মত হযরত মুফতী আহমদ ইয়ার খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ তাফসীরে নঈমীতে লিখেন: গণনা করা, গণনার বিপরীতে বিনিময় গ্রহণ করা এবং প্রদান করা সবই হারাম। (নূরুল ইরফান, ৭ম পারা, আল মায়িদা, ৯০নং আয়াতের পাদটিকা)صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّدইস্তেখারার শিক্ষা দিতেনমদীনার তাজেদার, হুযুরে আনওয়ার صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم লোকদেরকে গণনার পরিবর্তে ইস্তেখারার শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ থেকে বণির্ত , রাসূলে আকরম, নূরে মুজাসসাম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم কোরআনের সূরা শিক্ষা দেওয়ার ন্যায় আমাদেরকে যে কোন বিষয়ে ইস্তেখারা করার শিক্ষা দিতেন। (বুখারী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, বাবু মা’জা ফিত তাতউয়ি মাছনা মাছনা, ১/ ৩৯৩, হাদীস- ১১৬২)
প্রসিদ্ধ মুফাসসির, হাকীমুল উম্মত হযরত মুফতী আহমদ ইয়ার খান رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ হাদীস শরীফটির আলোকে লিখেন: ইস্তেখারা মানে হলো মঙ্গল কামনা করা বা কারো নিকট হতে ভাল পরামর্শ গ্রহণ করা। যেহেতু ইস্তেখারার নামাযে এবং দোয়ায় বান্দা যেনো স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার নিকট পরামর্শ চায় যে, অমুক কাজটি করবো কি করবো না! তাই একে ইস্তেখারা বলা হয়। (মিরাতুল মানাজীহ, ২/ ৩০১)
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّدযেই ব্যক্তি ইস্তেখারা করবে সে ক্ষতির শিকার হবে নাহুযূরে আকরাম, নূরে মুজাসসাম, শাফেয়ে বনী আদম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: مَا خَابَ مَنِ اسْتَخَارَ، وَلَا نَدِمَ مَنِ اسْتَشَارَ، وَلَا عَالَ مَنِ اقْتَصَدَ অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইস্তেখারা করবে, সে ব্যক্তি ক্ষতির শিকার হবে না। যে ব্যক্তি পরামর্শের মাধ্যমে কাজ করে, সে আক্ষেপের শিকার হবে না আর যে ব্যক্তি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করবে, সে ব্যক্তি কখনো অভাবে পড়বে না। (মাজমাউয যাওয়ায়িদ, কিতাবুস সালাত, বাবুল ইস্তেখারা, ২/ ৫৬৬, হাদীস- ৩৬৭০)
ইস্তেখারা না করার ক্ষতিপ্রিয় নবী صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: مِنْ شِقَاوَةِ ابْنِ آدَمَ تَرْكُهُ اسْتِخَرَةَ اللهِ অর্থাৎ বান্দার দূর্ভাগ্যের মধ্যে একটি যে, আল্লাহ তায়ালার নিকট ইস্তেখারা না করা। (তিরমিযী, কিতাবুল কদর, বাবু মা’জা ফির রযা বিল কযা, ৪/ ৬০, হাদীস- ২১৫৮)صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد
(ইস্তেখারা ও ইস্তেখারার নামাযের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এই লিখাটি দেখুন)নীল নদের নামে চিঠিপ্রতি বৎসর নীল নদ শুকিয়ে যেতো, তাই অজ্ঞতার কারণে সেখানে এই কু-প্রথা ছিলো যে, নদটি বলি চাইছে। অতএব তারা কোন এক কুমারী মেয়েকে উন্নত পোষাক আর অলঙ্কার দ্বারা সজ্জিত করে নীল নদে বলি দিতো, ফলে নদের পানি যথারীতি প্রবাহিত হয়ে যেতো, যখন মিসর জয় হলো, মিসরবাসীরা এসে একদা হযরত সায়্যিদুনা আমর বিন আস رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُএর নিকট আবেদন করলো: ‘হে আমাদের আমীর! আমাদের নীল নদের একটি নিয়ম প্রচলিত আছে, যতক্ষণ তা পালন করা হবে না, ততক্ষণ নদীও প্রবাহিত হয় না।’ তিনি رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ সেই নিয়মটি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তারা বললো: আমরা একজন কুমারী মেয়েকে তার মা-বাবার নিকট থেকে চেয়ে নিয়ে উন্নত পোষাক আর অলঙ্কার দ্বারা সজ্জিত করে নীল নদে বলি দিয়ে থাকি। হযরত সায়্যিদুনা আমর বিন আস رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ বললেন: ইসলামে কখনো তা হতে পারে না, পুরোনো সব অশুভ প্রথাকে ইসলাম ধূলিসাৎ করেছে, সুতরাং সেই কু-প্রথাকে আটকে রাখা হলো, তাই পানিও কমে যেতে থাকলো, এমনকি এক পর্যায়ে লোকজন সেখান থেকে অন্যত্র চলে যাবার জন্য তৈরি হতে লাগলো। এই অবস্থা দেখে হযরত সায়্যিদুনা আমর বিন আস رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ দ্বিতীয় খলীফা আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ফারূক رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ এর নিকট সব ঘটনা লিখে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি উত্তরে লিখলেন: ‘আপনি ঠিকই করেছেন, ইসলাম নিশ্চয় এসব অশুভ প্রথাকে দূরীভূত করে, এই চিঠির সাথে একটি চিরকুটও রয়েছে, তা নীল নদে ফেলে দেবেন।’ যখন হযরত সায়্যিদুনা আমর বিন আস رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ এর নিকট আমিরুল মুমিনীনের পত্রখানি পৌঁছলো, তিনি رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ চিরকুটটি বের করলেন। চিরকুটটিতে লেখা ছিলো: “হে নীল নদ! তুমি যদি নিজ থেকে প্রবাহিত হয়ে থাকো, তবে তুমি আর প্রবাহিত হইও না। তোমাকে যদি আল্লাহ তায়ালা প্রবাহিত করেন, তবে আল্লাহ তায়ালার নিকট আবেদন করছি, তিনি যেনো তোমাকে প্রবাগিত করে দেন।” হযরত সায়্যিদুনা আমর বিন আস চিরকুটটি নীল নদে ফেললেন। ফলে রাতারাতি ১৬ গজ পানি বেড়ে গেলো আর এই অশুভ প্রথাটি মিসর থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। (আল আযমাতু লি আবিশ শায়খ আল ইসবাহানী, বাবু ছিফতিন নীল ওয়া মুনতাহাহু, ৩১৮ পৃষ্ঠা, হাদীস- ৯৪০)
صَلُّوا عَلَى الحَبِيب ! صَلَّى اللهُ تَعَالَى عَلى مُحَمَّد দুঃখজনক অবস্থাপ্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! নীল নদকে প্রবাহমান রাখার জন্য মিসরবাসীদের মাঝে যেভাবে ভুল বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত অশুভ প্রথা প্রচলিত ছিলো, অনুরূপ বর্তমান যুগেও বহু ভুল ও ভিত্তিহীন বিশ্বাস, সন্দেহ ও না-জায়িয রীতি-নীতি দিনের পর দিন বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে। এগুলো মূলতঃ কুসংস্কারের কারণেই হয়ে থাকে, তন্মধ্য হতে কতিপয় নিচে উল্লেখ করা হচ্ছে :
(১) সফর মাসকে অলক্ষুনে মনে করাযারা কুসংস্কারের সন্দেহবাতিকতার শিকার, তারা সফর মাসকে বিপদ-আপদ অবতীর্ণ হওয়ার মাস বলে মনে করে। বিশেষ করে মাসটির প্রথম দিকের তেরটি দিন যেগুলোকে ‘তেরা তেযী’ বলা হয়ে থাকে, সেগুলোকে অত্যন্ত অলক্ষুনে বলে জানে। সন্দেহবাতিকদের মনে এই বিষয়টি ঢুকে আছে যে, সফর মাসে নতুনভাবে ব্যবসা- বাণিজ্যের সূচনা করা যাবে না, এতে ক্ষতির আশঙ্কা বেশী, কোথাও যাত্রাও করা যাবে না, এক্সিডেন্টের আশঙ্কা রয়েছে, বিয়ে শাদী করা যাবে না, কন্যা বিদায় করা যাবে না, তবে পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়, অনুরূপভাবে এই মাসটিতে বড় ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেন ইত্যাদিও করে না। ঘরের বাইরে যাতায়াতও কমিয়ে দেয় এই ধারণায় যে, বিপদাপদ অবতীর্ণ হচ্ছে। ঘরের প্রতিটি বাসন-কোসন ভালভাবে ঝাড়া- মোছা করে। অনুরূপভাবে এই মাসটিতে যদি কোন পরিবারে কেউ মারা যায়, সেই পরিবারকে অলক্ষুনে বলে মনে করে, সেই পরিবারের সাথে যদি নিজের পুত্র কিংবা কন্যার সম্বন্ধের কথা পাকাপাকি হয়, তাও ভেঙ্গে দেয়। ‘তেরা তেযী’ নামে সাদা ছোলার নিয়াযও দিয়ে থাকে। ফাতেহা নিয়ায করা মুস্তাহাব ও সাওয়াবের কাজ এবং সব ধরনের হালাল রিযিক দ্বারা যে কোন মাসের যে কোন দিনে এই ফাতেহা ও নিয়ায করা যায়। কিন্তু এই কথা মনে করা যে, ‘তেরা তেযী’র ফাতেহা যদি দেওয়া না হয় এবং সাদা ছোলা ভেজে যদি বন্টন করা না হয়, তবে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের রুজি-রোজগারে বরকত কমে যাবে, এ ধরনের কাজ ও ধারণা একেবারেই ভিত্তিহীন।আরবদের মাঝে সফর মাসকে অলক্ষুনে বলে মনে করা হতোজাহেলীয়তের যুগে অর্থাৎ ইসলামের পূর্বেও সফর মাসকে নিয়ে লোকজন এই ধরনের অশুভ প্রথামূলক মনোভাব পোষণ করতো যে, এই মাসে বিপদ-আপদ অধিকহারে অবতীর্ণ হয়ে থাকে, তাই তারা এই মাসটির আগমনকে অলক্ষুনে বলে মনে করতো। (ওমদাতুল কারী, ৭০/১১০)সম্মানিত হওয়ার কারণে আরবরা তিনটি মাস যিলকাদ, যিলহজ্জ ও মুহাররমে যুদ্ধ-বিগ্রহ আর লুটতরাজ থেকে বিরত থাকতো, তারা অপেক্ষা করে থাকতো, এই নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়ে যাক, তারপর তারা বের হবে, লুটতরাজ করবে, তাই সফর মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথেই লুটতরাজ, রাহাজানি, যুদ্ধ-বিগ্রহের উদ্দেশ্যে তারা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তো, তখন তাদের ঘর মানবশূন্য হয়ে পড়তো, তাই বলা হতো صَفَرَ المَكَانِ ঘর শূন্য হয়ে গেছে। আরবরা যখন দেখলো যে, এই মাসে মানুষ খুন হচ্ছে, পরিবার-পরিজন মারা যাচ্ছে কিংবা শূন্য হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা তা থেকে এই অশুভ প্রথাটি গ্রহণ করলো যে, এই মাসটি তাদের জন্য অলক্ষুণে মাস। এই ভেবে তারা তাদের পরিবার-পরিজন মারা যাওয়ার কিংবা ধ্বংস হওয়ার মূল কারণে মনোযোগ দিলো না, নিজেদের গহির্ত ও মন্দ কর্মগুলো উপলব্দি করলো না। যুদ্ধ-বিগ্রহ ও কলহ ইত্যাদি থেকে নিজেদের বিরতও রাখলো না। সেই স্থলে তারা মাসটিকেই অলক্ষুণে বলে দিলো।
সফর মাস কিছুই নাআমাদের মক্কী মাদানী আকা صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم সফর মাসকে নিয়ে অশুভ প্রথাগত মনোভাবকে রহিত ঘোষণা করতে গিয়ে ইরশাদ করেন: لَا صَفَرَ “সফর কিছুই না”।(বুখারী, কিতাবুত তিব্ব, বাবুল জুযাম, ৪/২৪, হাদীস- ৫৭০৭) হযরত আল্লামা মাওলানা শাহ আব্দলু হক মুহাদ্দিস দেহলবী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ হাদীস শরীফটির ব্যাখ্যায় লিখেন: সাধারণ লোকেরা এই সফর মাসটিকে বালা-মুসিবত ও বিপদাপদ অবতীর্ণ হওয়ার মাস বলে মনে করে, এই মনোভাব ভুল ও রহিত, এর কোন বাস্তবতা নাই। (আশিআতুল লুমআত (ফার্সি), ৩/৬৬৪)সদরুশ শরীয়ত, বদরুত তরিকত হযরত আল্লামা মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ আমজাদ আলী আযমী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ লিখেন: মানুষ সফর মাসকে অলক্ষুণে হিসাবে জানে, এই মাসে তারা বিয়ে শাদী করেনা, কন্যাদান করেনা, এ ধরনের আরো অনেক কাজ তারা করেনা, কোথাও সফর করেনা, বিশেষ করে সফর মাসের প্রথম তেরটি দিনকে অনেক বেশি অলক্ষুণে বলে মনে করতো এসব হলো অজ্ঞতাজনিত কথা। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে: ‘সফর কোন কিছুই না’, অর্থাৎ এটিকে অলক্ষুণে বলে মনে করা মানুষের ভুল। অনুরূপভাবে যিলকাদ মাসকেও অনেক মানুষ খারাপ মনে করে থাকে, এটিকে বলে শূন্যের মাস, এটিও ভুল এবং প্রতি মাসের ৩, ১৩, ২৩, ৮, ১৮, ২৮ তারিখগুলোকে অনর্থক মনে করে। এ রূপ মনে করাও অনর্থক। (বাহারে শরীয়ত, ৩/৬৫৯)
——–লিখাটি আমীরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা “মুহাম্মদ ইলয়াস আত্তার” কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত ৯৪ পৃষ্ঠা সম্বলিত “অশুভ প্রথা” নামক রিসালার ২২-৩০ এবং ৩৬-৪০ নং পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই রিসালাটি অবশ্যই সংগ্রহে রাখুন। অন্যকে উপহার দিন। যারা মোবাইলে (পিডিএফ) রিসালাটি পড়তে চান তারা ফ্রি ডাউনলোড করুন ।ইসলামীক বাংলা বইয়ের লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুন
কুসংস্কার বিষয়ক লিখাটির প্রথম পর্ব, তৃতীয় পর্বমাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন

শাইখ আব্দুর রহমান আল-হুজাইফি -এর ১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক আগুনঝরা খুতবা

ইসলাম ইহুদ-নাসারাদের ইসলামের অধীর থেকে তাদের নিজ ধর্ম মতে চলার স্বীকৃতি দান করে-যদি তারা অর্থও নিরাপত্তামূলক বিষয়াদিতে ইসলামের আহকাম মেনে চলে। অর্থাৎ অর্থ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বা ষড়যন্ত্র করলে সে স্বীকৃতি বহাল থাকবে না। ইসলাম তাদেরকে কখনই ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করে না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
ধর্মীয় বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই, নিশ্চয় হেদায়েতের পথ গোমরাহি পথ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে। সুরা বাকারা : ২৫৬
তবে ইসলাম এটা পরিস্কারভাবে বলে যে, তাদের মতাদর্শ অবশ্যই বাতিল ও অগ্রাহ্য। তা সত্ত্বেও তাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয় না। কারণ, ইসলাম মানবতার প্রতি তার ন¤্র ও হিতাকাংখী সূলভ আচরণ দ্বারা তাদের চিন্তা-চেতনায় স্বাধীনতার প্রতি তার ন¤্র ও মার্জিত আচরণ দিয়ে তাদের চিন্তা-চেতনায় স্বাধীনতার সুযোগ দান করে। যাতে স্বাধীনভাবে যার ইচ্ছে ঈমান এনে মুসলমান হয়। আর যার ইচ্ছে কাফেরই থাকে। তারপরও যদি ইহুদ-নাসারা ও মুশরিকগণ ইসলামে প্রবেশ করে, ইসলাম তাদের আপন ভাইয়ের মতো করে বুকে টেনে নেয়। ফলে তারাও মুসলমানদের সত্যিকারের ভাই-ই হয়ে যায়। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে জাত-পাত, বর্ণ-গোত্র ইত্যাদির কোনো ভেদাভেদ নেই। ইসলামের সোনালী ইতিহাস যার জ¦লন্ত স্বাক্ষী।
মহান আল্লাহ বলেন,
হে মানবসকল! আমি তোমাদের সবাইকে এক পুরুষ ও নারী আদম -হাওয়া থেকে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান সেই, যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে অধিকতর ভয় করে চলে। সুরা হুজুরাত : ১৩

ধর্মীয় সম্প্রীতির শ্লোগান দিয়ে সকলধর্ম সঠিক এবং একটি অপরটির কাছাকাছি এমন ধারণাকে ইসলাম কখনই প্রশ্রয় দেয় না। বরং ইসলাম এটাকে ভয়াবহ মনে করে এবং অস্বীকার করে। এমন শ্লোগান দিয়ে, ইসলামকে ইহুদীবাদ খ্রীষ্টাবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলার অপপ্রয়াস অবান্তর। এমন কখনই সম্ভব নয় । আর হবে
তাদের কাছে অত্যন্ত কঠিন মনে হয়। আল্লাহ যাকে চান বেছে নিয়ে নিজের দিকে টানেন। আর যে-কেউ তার অভিমুখী হয় তাকে নিজের কাছে পৌঁছে দেন। সুরা শুরা : ১৩
ইহুদি পন্ডিত ও খ্রীষ্টান পাদ্রীগণ খুব ভালোভাবেই জানত, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধর্মই একমাত্র সত্য ধর্ম। তিনিই সর্বশেষ নবি। কিন্তু তাঁর অনুসরণে, তাকে সর্বশেষ নবি মানতে প্রতিবন্ধক তাদের হিংসা। অহম। পার্থিব জগতের কুৎসিত মোহ আর মনের কু-প্রবৃত্তি। অথচ তারাও জানে, তাঁকে না-মানা, তাঁর প্রতি এমনতর বিদ্বেস তাদের কোনো প্রকার উপকারে আসবে না। তাদের দৈারাত্ব অনেক আগে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের আগেই তাদের প্রতি অবতীর্ণ আসমানী গ্রন্থগুলি রদবদলের মতো জঘণ্য কাজটি করেছে। তাঁদের ধর্মের মারাত্মক বিকৃতি ঘটিয়েছে। তারা নিশ্চিতভাবে কুফরি ও পথ ভ্রষ্টতায় লিপ্ত।
হক ও বাতিলের এ সংক্ষিপ্ত স্বরূপ উন্মোচনের পর বলতে হয়, বর্তমান যুগের কিছু ইসলামি চিন্তাবিদগণ, যারা ইসলামি আকিদার প্রাথমিক ও মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে পর্যন্ত ওয়াকিফ নন, তারা একটি নতুন দাওয়াত উত্থাপনের অপচেষ্টায় মেতে উঠেছেন। একদিকে কিভাবে ইসলাম এবং ইহুদি ও খ্রীষ্টবাদকে পরষ্পর নিকটবর্তী করা যায়। আর অন্যদিকে কিভাবে আহলে সুন্নাতের আকিদা ও শিয়া মতাদর্শকে পরষ্পর নিকবর্তী করা যায়। এ বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। বরং এমন চিন্তা-চেতনা এ যুগে অত্যন্ত ভয়ংকর। আজ যখন বিশ্বব্যাপি মুসলিম-অমুসলিমদের মধ্যকার সকললড়াই ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সংঘটিত হচ্ছে । ধর্মীয় স্বার্থেই আজ যতসব বিবাদ। তবে হক-বাতিলের এমন প্রকাশ্য দ্বন্ধে, বিপরীত ধর্মী দুটি ধারার একত্রিকরণ আদো কি সম্ভব? ইসলাম ইহুদি-নাসারাগণকে বাতিলের রাস্তা পরিহার করে জান্নাতের অধিকারী হওয়ার প্রকাশ্য দাওয়াত দিচ্ছে।
আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
হে আসমানী কিতাবপ্রাপ্ত ইহুদ-নাসারারা! এসো এমন বাণী গ্রহণের পথে, যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে সমানভাবে স্বীকৃত, আর তা হলো, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও দাসত্ব করব না, আল্লাহর সঙ্গে কাউকেই শরিক সাব্যস্ত করব না, আল্লাহর সঙ্গে আর কাউকে পরষ্পর রব বলে স্বীকৃতি দেব না। অতএব তারা যদি (এ দাওয়াত গ্রহণ থেকে বিমুখ হয়, তাহলে হে মু’মিনগণ) তোমরা তাদেরকে পরিস্কার বলেও দাও , তোমরা সাক্ষী থাকÑ ‘নিশ্চয় আমরা মুসলমান’।
সুরা আলে ইমরান, ৬৪

ইসলাম ইহুদ-নাসারাদের ইসলামের অধীর থেকে তাদের নিজ ধর্ম মতে চলার স্বীকৃতি দান করে-যদি তারা অর্থও নিরাপত্তামূলক বিষয়াদিতে ইসলামের আহকাম মেনে চলে। অর্থাৎ অর্থ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বা ষড়যন্ত্র করলে সে স্বীকৃতি বহাল থাকবে না। ইসলাম তাদেরকে কখনই ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করে না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
ধর্মীয় বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই, নিশ্চয় হেদায়েতের পথ গোমরাহি পথ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে। সুরা বাকারা : ২৫৬
তবে ইসলাম এটা পরিস্কারভাবে বলে যে, তাদের মতাদর্শ অবশ্যই বাতিল ও অগ্রাহ্য। তা সত্ত্বেও তাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয় না। কারণ, ইসলাম মানবতার প্রতি তার ন¤্র ও হিতাকাংখী সূলভ আচরণ দ্বারা তাদের চিন্তা-চেতনায় স্বাধীনতার প্রতি তার ন¤্র ও মার্জিত আচরণ দিয়ে তাদের চিন্তা-চেতনায় স্বাধীনতার সুযোগ দান করে। যাতে স্বাধীনভাবে যার ইচ্ছে ঈমান এনে মুসলমান হয়। আর যার ইচ্ছে কাফেরই থাকে। তারপরও যদি ইহুদ-নাসারা ও মুশরিকগণ ইসলামে প্রবেশ করে, ইসলাম তাদের আপন ভাইয়ের মতো করে বুকে টেনে নেয়। ফলে তারাও মুসলমানদের সত্যিকারের ভাই-ই হয়ে যায়। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে জাত-পাত, বর্ণ-গোত্র ইত্যাদির কোনো ভেদাভেদ নেই। ইসলামের সোনালী ইতিহাস যার জ¦লন্ত স্বাক্ষী।
মহান আল্লাহ বলেন,
হে মানবসকল! আমি তোমাদের সবাইকে এক পুরুষ ও নারী আদম -হাওয়া থেকে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান সেই, যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে অধিকতর ভয় করে চলে। সুরা হুজুরাত : ১৩

ধর্মীয় সম্প্রীতির শ্লোগান দিয়ে সকলধর্ম সঠিক এবং একটি অপরটির কাছাকাছি এমন ধারণাকে ইসলাম কখনই প্রশ্রয় দেয় না। বরং ইসলাম এটাকে ভয়াবহ মনে করে এবং অস্বীকার করে। এমন শ্লোগান দিয়ে, ইসলামকে ইহুদীবাদ খ্রীষ্টাবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলার অপপ্রয়াস অবান্তর। এমন কখনই সম্ভব নয় । আর হবেও না।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
সমান হতে পারে না অন্ধ ও চক্ষুষ্মান। আর না অন্ধকার ও আলো, ছায়া ও রোদ সমান হতে পারে। সমান হতে পারে না জীবিত ও মৃত। নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়েত বাণী শ্রবণ করার তাওফিক দান করেন। আর যারা কবরে আছেন, তুমি তাদের কখনই হেদায়তের বাণী শুনাতে পার না। সুরা ফাতির : ১৯, ২০, ২১ ও ২২

আর একজন মুসলিম ইহুদী ও খৃষ্টানদের কাছাকাছি হওয়ার মাপকাঠি যদি এই হয়, মুসলিম তাদের মনোবাঞ্চা পূরণ করবে। তাদের সাথে বন্ধুত্বের খাতিরে দ্বীনের কিছু আহকাম ছেড়ে দেবে। কিংবাা দ্বীনের পূর্ণ বা কিছু অংশ বাস্তবায়নে শিথিলতা অবলম্বন করবে। এমনটা একজন সত্যিকার মুসলিমের পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। কোনো মুসলমান এমন করতেই পারে না।
আল্লাহ তাআ’লা ইরশাদ করেন,
এমন লোক, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী। তুমি তাদের ঐ সকল ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনকারী পাবে না, যারা আল্লাহ ও রাসুলের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত। যদিও তারা তাদের পিতা-মাতা, সন্তান কিংবা ভাই ও সমগোত্রের লোকই হোক না কেন! সুরা মুজাদালা : ২২

ইসলাম মুসলমানদের ইহুদ-নাসারাসহ অন্যান্য কাফিরদের সাথে নিরাপদ ধর্মীয় দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। এতদসত্ত্বেও ইসলাম ভীনধর্মীদের উপর জুলুম-নির্যাতন করতে কঠোর নিষেধ করে। বরং তাদের সাথে উদার মানসিকতা প্রকাশ ও পার্থিব বিষয়ে ভাল আচরণ করার নির্দেশ দেয়। একদিকে ধর্মীয় দুরত্ব অন্যদিকে সুন্দর সামাজিক সহাবস্থানের নির্দেশের সাথে মুসলমানরা এ মর্মে শক্তভাবে আদিষ্ট যে, হকের পক্ষে বাতিলের বিরুদ্ধে মোকাবেলা করে হক প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে আর বাতিলের অবদমনে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে। এভাবে আকিদার বেলায় অন্যান্য ধর্ম থেকে পার্থক্য বজায় রেখে চলা, ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলীকে শক্ত হাতে ধারণ করা এবং ঈমান-ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার মধ্যেই মুসলমানদের জন্য ইহ-পরকালীন সৌভাগ্য, তাদের যাবতীয় সুবিধা ও সম্মান নিহিত। আল্লাহই একমাত্র হকের সাহায্যকারী আর বাতিলের বিনাশকারী।

আর ইহুদী নাসারা ও অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে ইসলামকে একসাথ করার প্রয়াসÑ একটি মিশ্র ধর্ম তেরী করার মতই। বরং দ্বীন ইসলামের সম্পূর্ণরূপে পরিপন্থী। যা এক ভয়াবহ ফেতনা ও ধর্মীয় বিপর্যয়ের কারণ । এমনটা ইসলামের আক্বীদাসমূহ ছিন্ন-ভিন্ন করে দেবে। মুমিনরা ঈমানে দূর্বল হয়ে যাবে এবং আল্লাহর দুশমনদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের মোক্ষম সুযোগ তৈরী হয়ে যাবে। যা শেষ পর্যন্ত ইসলামের অস্থিত্বকেও মিটিয়ে দেবে। অথচ আল্লাহ মুমিনদের পরস্পর বন্ধুত্ব স্থাপনের নির্দেশ দান করে বলেছেন,
মুমিন নর-নারীগণ পরস্পর বন্ধু। সুরা তাওবা : ৭১
আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন যে, কাফির-মুশরিকরা পরষ্পর যতই মত পার্থক্য থাকুক না কেন, তারা পরষ্পর বন্ধু। মহান আল্রাহ ইরশাদ করেন,
আর যারা অবিশ্বাসী কাফির, তারা পরষ্পর বন্ধু। তোমরা মুসলমানরা যদি এমন না কর, (অর্থাৎ মুশরিক পৌত্তলিকদের থেকে দুরত্ব বজায় রেখে মুমিনগণের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন না কর) তাহলে পৃথিবীতে মহা ফেৎনা-ফ্যাসাদ বিস্তার লাভ করবে। সুরা আনফাল : ৭৩
প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম ইবনে কছীর রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, তোমরা মুসলমানগণ যদি কাফির-মুশরিকগণ থেকে দুরত্ব বজায় না রাখ এবং মুমিনগণের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন না কর, তাহলে মানুষের মধ্যে ইসলাম ধর্মের ব্যাপারে মহা ফিৎনা সৃষ্টি হবে। এভাবে যে, ইসলাম ও অন্যান্য ধর্ম মিশ্রিত হয়ে যাবে । মুসলমান কাফের একাকার হয়ে ইসলাম ও মুসলমান সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং মানুষ মহা ফেৎনা-ফ্যাসাদের শিকার হয়ে পড়বে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
হে মুমিনগণ! ইহুদ-নাসারাগণকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, তারা তাদের মধ্যেই পরিগণিত হবে। সুরা মায়েদা: ৫১

শাইখ আব্দুর রহমান আল-হুজাইফি -এর ১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক আগুনঝরা খুতবা

[ শাইখ আব্দুর রহমান আল-হুজাইফি। মসজিদে নববির সম্মানিত খতিব। আকষ্মিকভাবে ১৯৯৮ সালে ঈদুল আযহার আগের জুমায় জাজিরাতুল আরবে অবস্থানকারী বৃটিশ-মার্কিন-ফরাসী সৈন্যদের বিরুদ্ধে সউদি হুকুমতের প্রথাবিরোধী আগুনঝরা বক্তৃতা দিলেন। বিশেষ করে শিয়াদের বিরুদ্ধে তার অনড় অবস্থান, তাদের দৌরাত্ম স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তার বয়ানে। রাগে ক্রোধে ফেটে পড়ছিলেন প্রতিটি শব্দের উচ্চারণে। ভাষণের প্রতিটি শব্দই যেন বুক ঝাঁঝরা করা বারুদ। বিষ্ময়ের ব্যপার হলো, ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্টের সরকারী সফর চলাকালীন সময়ে কেন তিনি হঠাৎ এতটা কঠোর হুঁশিয়ারি করলেন শিয়াদের ব্যাপারে? শিয়াদের অভিহিত করলেন ইহুদি-খৃষ্টানদের চেয়েও আরো জঘন্য বলে। অথচ সৌদি সরকারের রাজকীয় মেহমান হিসেবে স্বয়ং ইরানী প্রেসিডেন্ট রফসানজানী উপস্থিত ছিলেন সে দিনের জুমাতে। ভাষণটি ভাষান্তর করে দেওয়া হলো]

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর তায়ালার। যিনি সমগ্র আলমের রব। সত্য, ন্যায় ও অন্যায়, সবকিছুর বিশদ বর্ণনাকারী। যিনি হেদায়েত ও ইয়াকিন দিয়ে মুমিনদের আত্মাকে করেছেন আলোকিত । আর শক্তিশালী করেছেন ওহীর বাণী দিয়ে তাদের অন্তর চক্ষুকে। নিজ রহমতে যাকে ইচ্ছে তিনি হেদায়েত দান করেন। আর নিজ হিকমত দিয়ে যাকে ইচ্ছে করেন পথভ্রষ্ট, ঘোমরাহ । কাফির ও মুনাফিকদের অন্তরাত্মা চিরঅন্ধ, তাতে হক্বের আলো একদম নেই । সকল সৃষ্টির উপর একমাত্র মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালা। তার প্রমাণ সুস্পষ্ট। প্রতিষ্ঠিত।

আমার রবের প্রশংসা করছি । তাঁরই শোকর আদায় করছি। তিনি সত্তায়, ক্ষমতায় যেমন পরাক্রমশালী, অসীম ও অদ্বিতীয়Ñ শোকর-প্রশংসা করছি তেমন শানানুযায়ী। সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। ইবাদতের মালেক নয় কেউ। তিনি একক, লা-শারিক। বিচার দিনের তিনিই মালিক। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমাদের নবি, আমাদের সাইয়্যেদ হযরত মুহাম্মদ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা। তাঁর রাসূল। তিনি পূর্বাপর সমগ্র বিশ্বের নেতা । যিনি প্রেরিত হয়েছেন ঐশি গ্রন্থ আল-কুরআন নিয়ে। সমস্ত মুসলমানদের জন্য যা হেদায়েত ও সুসংবাদ বহনকারী। আয় আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দা, তোমার মাহবুব রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবারবর্গ এবং তাঁর প্রিয় সাথী ও অনুসারীদের প্রতি অসংখ্য সালাত ও সালাম প্রেরণ করছি।

হে মুসলমানগণ!
আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহকে ভয় কর যেমন ভয় করা উচিত। ইসলামের রজ্জুকে শক্ত হাতে ধারণ কর।
আল্লাহর বান্দাগণ!
মানুষকে আল্লাহ তায়ালা যত নিয়ামত দান করেছেন, অসংখ্য-অগণিত, সত্য ধর্ম ইসলাম হচ্ছে তন্মধ্যে সবচে বড়, শ্রেষ্ঠতম। যা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে মৃত্যুসম কুফরী থেকে জীবন দান করেন। আর গোমরাহীর আঁধার থেকে হিদায়াতের আলোতে নিয়ে আসেন।
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,
যে ব্যক্তি মৃত, আর আমি তাকে (ইসলামের দিয়ে) জীবন দান করলাম এবং দান করলাম এমন একটি আলোকবর্তিকা, যা নিয়ে সে মানুষের মাঝে চলাফেরা করে। সে কি ঐ ব্যক্তির মতো হতে পারে, যার অবস্থা এই যে, যে অন্ধকার দ্বারা পরিবেষ্টিত, যা থেকে কখনও বের হতে পারবে না। সূরা আনয়াম : ১২২
আল্লাহ পাক আরও ইরশাদ করেন,
যে ব্যক্তি নিশ্চিত বিশ^াস রাখে যে, তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমার কাছে যা নাযিল হয়েছে তা সত্য। সে কি ওই ব্যক্তির মতো হতে পারে, যে অন্ধ? বস্তুত উপদেশ কেবল তারাই গ্রহণ করে, যারা বোধ-বুদ্ধির অধিকারী। সুরা রাআদ : ১৯

পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য একমাত্র ইসলামই আল্লাহ তায়ালার মনোনীত ধর্ম । যা হযরত আদম আ. থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্তÑ তাওহীদ ও রিসালতের মূলবাণীতে একই রকম। তবে যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক নবির কাছে উম্মতের উপযোগী করে বিধান নাযিল করেছেন। মৌলিক বিষয়গুলোতে তেমন পার্থক্য ছিল না। পরবর্তীতে নিজ হিকমত মতো কিছু বিধান রহিত করেছেন। আবার নতুন নতুন অনেক বিষয়ের অবতারণাও করেছেন। আর এটা করার মালিকও একমাত্র তিনিই। মোটের উপর যখন বান্দার জন্য যে সকল বিষয় উপকারী ও সার্বজনীন, সে সব বিষয়ে নবিদের মাধ্যমে গোটা মানব জাতিকে আল্লাহ তায়ালাই সবকিছু শিক্ষা দিয়েছেন।

সর্বশেষ আল্লাহ তায়ালা মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করলেন। তাকেই প্রেরণ করে তাঁর আগের সকল শরীয়তকে রহিত করে দিয়েছেন। মানব-দানব সবাইকে একমাত্র তারই প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁর অনুসরণের জন্য আদেশ করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
বলুন, হে মানুষ-সকল! নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের প্রতি ঐ মহান আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত, যার হাতে রয়েছে আসমান-যমীনের রাজত্ব। তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। জীবন-মরণ একমাত্র তিনিই দান করেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং ঐ মহান উম্মী নবির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর । যিনি আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর যাবতীয় বাণীসমূহের প্রতি বিশ্বাসী। এতে তোমরা হেদায়ত প্রাপ্ত হবে।
সূরা আরাফ : ১০৮
হাদিসে পাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
ঐ মহান সত্ত্বার কসম, যার কুদরতি হাতে আমার জীবন, পৃথিবীর কোন ইহুদী কিংবা খ্রীষ্টান আমার নবুয়ত সম্পর্কে শুনল অথচ আমার প্রতি ঈমান আনল না, সে নিশ্চিত জাহান্নামে প্রবেশ করবে। সুতরাং যারা আল্লাহর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনবেনা, তারা নি:সন্দেহে জাহান্নামী।
ইসলাম ছাড়া অন্য যত ধর্ম, আল্লাহ তায়ালার কাছে তা ধর্মই নয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
ইসলামই হলো আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনিত ধর্ম। সূরা আলে ইমরান : ১৯
আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন,
আর যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করে, কখনই তা গ্রহণ করা হবে না। আর আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থ। সুরা আল ইমরান : ৮৫
রব্বে কারিম রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরিপূর্ণ ও সার্বজনীন ধর্ম দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। এ ধর্মে আল্লাহর তায়ালার একাত্ববাদের কথা যেমন সুস্পষ্ট, তেমনি পূর্ববর্তী সকল নবি ও তাদের ধর্মগ্রন্থের বিশ^াসের কথাও রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :
আল্লাহ তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই পন্থাই স্থির করেছেন, যার হুকুম দিয়েছিলেন তিনি নুহকে এবং (হে রাসুল) যা আমি ওহির মাধ্যমে তোমার কাছে পাঠিয়েছি এবং যার হুকুম দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মুসা ও ইসাকে যে, তোমরা দ্বীন কায়েম কর এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি করো না। ( তা সত্ত্বেও) তুমি মুশরিকদেরকে যে দিকে ডাকছ তা তাদের কাছে অত্যন্ত কঠিন মনে হয়। আল্লাহ যাকে চান বেছে নিয়ে নিজের দিকে টানেন। আর যে-কেউ তার অভিমুখী হয় তাকে নিজের কাছে পৌঁছে দেন। সুরা শুরা : ১৩
ইহুদি পন্ডিত ও খ্রীষ্টান পাদ্রীগণ খুব ভালোভাবেই জানত, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধর্মই একমাত্র সত্য ধর্ম। তিনিই সর্বশেষ নবি। কিন্তু তাঁর অনুসরণে, তাকে সর্বশেষ নবি মানতে প্রতিবন্ধক তাদের হিংসা। অহম। পার্থিব জগতের কুৎসিত মোহ আর মনের কু-প্রবৃত্তি। অথচ তারাও জানে, তাঁকে না-মানা, তাঁর প্রতি এমনতর বিদ্বেস তাদের কোনো প্রকার উপকারে আসবে না। তাদের দৈারাত্ব অনেক আগে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের আগেই তাদের প্রতি অবতীর্ণ আসমানী গ্রন্থগুলি রদবদলের মতো জঘণ্য কাজটি করেছে। তাঁদের ধর্মের মারাত্মক বিকৃতি ঘটিয়েছে। তারা নিশ্চিতভাবে কুফরি ও পথ ভ্রষ্টতায় লিপ্ত।
হক ও বাতিলের এ সংক্ষিপ্ত স্বরূপ উন্মোচনের পর বলতে হয়, বর্তমান যুগের কিছু ইসলামি চিন্তাবিদগণ, যারা ইসলামি আকিদার প্রাথমিক ও মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে পর্যন্ত ওয়াকিফ নন, তারা একটি নতুন দাওয়াত উত্থাপনের অপচেষ্টায় মেতে উঠেছেন। একদিকে কিভাবে ইসলাম এবং ইহুদি ও খ্রীষ্টবাদকে পরষ্পর নিকটবর্তী করা যায়। আর অন্যদিকে কিভাবে আহলে সুন্নাতের আকিদা ও শিয়া মতাদর্শকে পরষ্পর নিকবর্তী করা যায়। এ বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। বরং এমন চিন্তা-চেতনা এ যুগে অত্যন্ত ভয়ংকর। আজ যখন বিশ্বব্যাপি মুসলিম-অমুসলিমদের মধ্যকার সকললড়াই ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সংঘটিত হচ্ছে । ধর্মীয় স্বার্থেই আজ যতসব বিবাদ। তবে হক-বাতিলের এমন প্রকাশ্য দ্বন্ধে, বিপরীত ধর্মী দুটি ধারার একত্রিকরণ আদো কি সম্ভব? ইসলাম ইহুদি-নাসারাগণকে বাতিলের রাস্তা পরিহার করে জান্নাতের অধিকারী হওয়ার প্রকাশ্য দাওয়াত দিচ্ছে।
আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
হে আসমানী কিতাবপ্রাপ্ত ইহুদ-নাসারারা! এসো এমন বাণী গ্রহণের পথে, যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে সমানভাবে স্বীকৃত, আর তা হলো, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও দাসত্ব করব না, আল্লাহর সঙ্গে কাউকেই শরিক সাব্যস্ত করব না, আল্লাহর সঙ্গে আর কাউকে পরষ্পর রব বলে স্বীকৃতি দেব না। অতএব তারা যদি (এ দাওয়াত গ্রহণ থেকে বিমুখ হয়, তাহলে হে মু’মিনগণ) তোমরা তাদেরকে পরিস্কার বলেও দাও , তোমরা সাক্ষী থাকÑ ‘নিশ্চয় আমরা মুসলমান’।
সুরা আলে ইমরান, ৬৪

ইসলাম ইহুদ-নাসারাদের ইসলামের অধীর থেকে তাদের নিজ ধর্ম মতে চলার স্বীকৃতি দান করে-যদি তারা অর্থও নিরাপত্তামূলক বিষয়াদিতে ইসলামের আহকাম মেনে চলে। অর্থাৎ অর্থ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বা ষড়যন্ত্র করলে সে স্বীকৃতি বহাল থাকবে না। ইসলাম তাদেরকে কখনই ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করে না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
ধর্মীয় বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই, নিশ্চয় হেদায়েতের পথ গোমরাহি পথ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে। সুরা বাকারা : ২৫৬
তবে ইসলাম এটা পরিস্কারভাবে বলে যে, তাদের মতাদর্শ অবশ্যই বাতিল ও অগ্রাহ্য। তা সত্ত্বেও তাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয় না। কারণ, ইসলাম মানবতার প্রতি তার ন¤্র ও হিতাকাংখী সূলভ আচরণ দ্বারা তাদের চিন্তা-চেতনায় স্বাধীনতার প্রতি তার ন¤্র ও মার্জিত আচরণ দিয়ে তাদের চিন্তা-চেতনায় স্বাধীনতার সুযোগ দান করে। যাতে স্বাধীনভাবে যার ইচ্ছে ঈমান এনে মুসলমান হয়। আর যার ইচ্ছে কাফেরই থাকে। তারপরও যদি ইহুদ-নাসারা ও মুশরিকগণ ইসলামে প্রবেশ করে, ইসলাম তাদের আপন ভাইয়ের মতো করে বুকে টেনে নেয়। ফলে তারাও মুসলমানদের সত্যিকারের ভাই-ই হয়ে যায়। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে জাত-পাত, বর্ণ-গোত্র ইত্যাদির কোনো ভেদাভেদ নেই। ইসলামের সোনালী ইতিহাস যার জ¦লন্ত স্বাক্ষী।
মহান আল্লাহ বলেন,
হে মানবসকল! আমি তোমাদের সবাইকে এক পুরুষ ও নারী আদম -হাওয়া থেকে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান সেই, যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে অধিকতর ভয় করে চলে। সুরা হুজুরাত : ১৩

ধর্মীয় সম্প্রীতির শ্লোগান দিয়ে সকলধর্ম সঠিক এবং একটি অপরটির কাছাকাছি এমন ধারণাকে ইসলাম কখনই প্রশ্রয় দেয় না। বরং ইসলাম এটাকে ভয়াবহ মনে করে এবং অস্বীকার করে। এমন শ্লোগান দিয়ে, ইসলামকে ইহুদীবাদ খ্রীষ্টাবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলার অপপ্রয়াস অবান্তর। এমন কখনই সম্ভব নয় । আর হবে
তাদের কাছে অত্যন্ত কঠিন মনে হয়। আল্লাহ যাকে চান বেছে নিয়ে নিজের দিকে টানেন। আর যে-কেউ তার অভিমুখী হয় তাকে নিজের কাছে পৌঁছে দেন। সুরা শুরা : ১৩
ইহুদি পন্ডিত ও খ্রীষ্টান পাদ্রীগণ খুব ভালোভাবেই জানত, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধর্মই একমাত্র সত্য ধর্ম। তিনিই সর্বশেষ নবি। কিন্তু তাঁর অনুসরণে, তাকে সর্বশেষ নবি মানতে প্রতিবন্ধক তাদের হিংসা। অহম। পার্থিব জগতের কুৎসিত মোহ আর মনের কু-প্রবৃত্তি। অথচ তারাও জানে, তাঁকে না-মানা, তাঁর প্রতি এমনতর বিদ্বেস তাদের কোনো প্রকার উপকারে আসবে না। তাদের দৈারাত্ব অনেক আগে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের আগেই তাদের প্রতি অবতীর্ণ আসমানী গ্রন্থগুলি রদবদলের মতো জঘণ্য কাজটি করেছে। তাঁদের ধর্মের মারাত্মক বিকৃতি ঘটিয়েছে। তারা নিশ্চিতভাবে কুফরি ও পথ ভ্রষ্টতায় লিপ্ত।
হক ও বাতিলের এ সংক্ষিপ্ত স্বরূপ উন্মোচনের পর বলতে হয়, বর্তমান যুগের কিছু ইসলামি চিন্তাবিদগণ, যারা ইসলামি আকিদার প্রাথমিক ও মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে পর্যন্ত ওয়াকিফ নন, তারা একটি নতুন দাওয়াত উত্থাপনের অপচেষ্টায় মেতে উঠেছেন। একদিকে কিভাবে ইসলাম এবং ইহুদি ও খ্রীষ্টবাদকে পরষ্পর নিকটবর্তী করা যায়। আর অন্যদিকে কিভাবে আহলে সুন্নাতের আকিদা ও শিয়া মতাদর্শকে পরষ্পর নিকবর্তী করা যায়। এ বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। বরং এমন চিন্তা-চেতনা এ যুগে অত্যন্ত ভয়ংকর। আজ যখন বিশ্বব্যাপি মুসলিম-অমুসলিমদের মধ্যকার সকললড়াই ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সংঘটিত হচ্ছে । ধর্মীয় স্বার্থেই আজ যতসব বিবাদ। তবে হক-বাতিলের এমন প্রকাশ্য দ্বন্ধে, বিপরীত ধর্মী দুটি ধারার একত্রিকরণ আদো কি সম্ভব? ইসলাম ইহুদি-নাসারাগণকে বাতিলের রাস্তা পরিহার করে জান্নাতের অধিকারী হওয়ার প্রকাশ্য দাওয়াত দিচ্ছে।
আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
হে আসমানী কিতাবপ্রাপ্ত ইহুদ-নাসারারা! এসো এমন বাণী গ্রহণের পথে, যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে সমানভাবে স্বীকৃত, আর তা হলো, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও দাসত্ব করব না, আল্লাহর সঙ্গে কাউকেই শরিক সাব্যস্ত করব না, আল্লাহর সঙ্গে আর কাউকে পরষ্পর রব বলে স্বীকৃতি দেব না। অতএব তারা যদি (এ দাওয়াত গ্রহণ থেকে বিমুখ হয়, তাহলে হে মু’মিনগণ) তোমরা তাদেরকে পরিস্কার বলেও দাও , তোমরা সাক্ষী থাকÑ ‘নিশ্চয় আমরা মুসলমান’।
সুরা আলে ইমরান, ৬৪

চলবে…

ভয়াবহ বিপদ, দুরুদুরু বক্ষে আসামের মুসলিমরা

“আমরা ৩০ জুলাইয়ের জন্য দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা করছি। শুধু আমরা অসমীয়া বাঙালিরা নই, অন্য অনেক গোষ্ঠীর মানুষই অপেক্ষা করে আছে ওই দিনটার জন্য।” আগামী সোমবার প্রকাশিত হবে জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর চূড়ান্ত খসড়া – যা নিয়ে আসামের কয়েক লক্ষ বাংলাভাষী হিন্দু-মুসলমান আশঙ্কায় আছেন যে তাদের নাম ওই তালিকায় থাকবে কিনা। বরাক উপত্যকায় শিলচর শহরের বাসিন্দা এবং আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি তপোধীর ভট্টাচার্য বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন। তার আশঙ্কার কথা। তার মতোই আগামী সোমবার ৩০ জুলাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছেন রাজ্যের একেবারে অন্য প্রান্তে, বাকসা জেলার শালবাড়ির বাসিন্দা, ছাত্র নেতা ইব্রাহিম আলিও অপেক্ষায় আছেন সেই দিনটার জন্য। “আমরা তো আশঙ্কায় আছি ওই দিন অনেক ভারতীয় নাগরিকের নামও না নাগরিকপঞ্জী থেকে বাদ পড়ে যায়” – বলছিলেন আলি।

আসাম রাজ্যে ১৯৫১ সালের পরে এই প্রথমবার নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদ করা হচ্ছে। নাগরিক পঞ্জী থেকে কারো নাম বাদ যাওয়ার অর্থ, তাদের অদূর ভবিষ্যতে বিদেশী বলে চিহ্নিত করা হবে। ভারতীয় নাগরিকত্ব খুইয়ে তারা অচিরেই পরিণত হবেন রাষ্ট্রবিহীন মানুষে। ইতিমধ্যেই বিদেশী বলে বহু মানুষকে চিহ্নিত করেছে আসামের ফরেনার্স ট্রাইবুনালগুলো। প্রায় নয় শ’ মানুষ আটক রয়েছেন বন্দী শিবিরে। বঙ্গাইগাঁও জেলার বাসিন্দা ও সারা আসাম বাঙালী ছাত্র যুব ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সম্রাট ভাওয়াল বলছিলেন, “এমন বহু মানুষকে বিদেশী বলে রায় দিয়েছে ট্রাইবুনালগুলো, যাদের সব নথিপত্র থাকা স্বত্ত্বেও শুধুমাত্র শুনানির দিন হাজিরা দেয়নি বলে একতরফা রায় হয়ে গেছে।”

“পুলিশও আগে হাজিরার নোটিস দেয়নি, তাই এরা জানতেই পারেনি যে তাদের নামে ট্রাইবুনালে মামলা হয়েছে। অথচ সেই পুলিশই বিদেশী রায় হওয়ার আধ ঘন্টার মধ্যে লোককে খুঁজে বার করে থানায় ডেকে নিয়ে যায়। ছবি আর আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। অনেক মানুষ এভাবে বিদেশী বলে চিহ্নিত হয়ে গেছেন।” হঠাৎ করে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার যে আশঙ্কা তৈরী হয়েছে, তার কারণ হল , ৩১ ডিসেম্বর মাঝরাতে প্রকাশিত হওয়া আংশিক খসড়া নাগরিক পঞ্জী।

সাবেক ভিসি তপোধীর ভট্টাচার্য বলছিলেন, ওই তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল বহু ভারতীয় নাগরিকের নাম, যার মধ্যে তার নিজের পরিবারের সদস্যদের নামও ছিল না।
তার কথায়, “এই যে আশঙ্কাটা তৈরী হয়েছে, তার যে একেবারে ভিত্তি নেই, তা তো নয়। ৩১ ডিসেম্বর যে আংশিক খসড়া প্রকাশ করা হয়েছিল, তার মধ্যে বহু সত্যিকারের ভারতীয় নাগরিকের নাম ছিল না। এদের অনেকেই পুরুষানুক্রমে আসামের বাসিন্দা এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি। তবুও তাদের নামও যখন বাদ পড়ে, তখন আশঙ্কা তো থাকবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে।” আসামের জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষ আসামে ঢুকে পড়েছেন। এই কথিত বিদেশীদের চিহ্নিত করতেই জাতীয় নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদ করার দাবি ওঠে।

কিন্তু খসড়া তালিকায় দেখা গেছে, বহু ভারতীয় নাগরিকের নামও বাদ পড়েছে, যেমন শালবাড়ির বাসিন্দা ছাত্র নেতা ইব্রাহিম আলির গোটা পরিবারের নামই ওই খসড়া তালিকায় ছিল না। “এর আগে যখন এন আর সি [জাতীয় নাগরিক পঞ্জী] হয়েছিল ১৯৫১ সালে, সেখানে আমার দাদুর নাম ছিল। আমার দাদুর নাম ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে। সেই ব্রিটীশ আমল থেকে জমির খাজনা দিয়েছি, তার রসিদ আছে। তবুও আমাদের গোটা পরিবারের কারো নাম আংশিক তালিকায় ওঠে নি,” – জানাচ্ছিলেন আলি।শুধু যে বাংলাভাষীদের নাম বাদ পড়েছিল ওই তালিকা থেকে তা নয়। বাদ গেছে অনেক অসমীয়া মানুষের নামও।

নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদ করার পেছনে যে ছাত্র সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছে, সেই অতি শক্তিশালী অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা আসুর প্রধান উপদেষ্টা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্য বলেন, “এটা ঠিকই, প্রথম খসড়া তালিকায় অনেক সত্যিকারের ভারতীয় নাগরিকের নাম বাদ গেছে। শুধু বাংলাভাষী নয়, অনেক অসমীয়া মানুষেরও নাম বাদ গেছে।” “আমার নিজের পরিবারের কিছু সদস্যের নামও ছিল না সেখানে। কিন্তু ওই আংশিক তালিকার পরে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়া হয়েছে – সত্যিকারের নাগরিক, যারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে এসেছেন, তাদের নাম নিশ্চই চূড়ান্ত তালিকায় থাকবে। এতে বাংলাভাষী মানুষদের আতঙ্কিত হওয়ার কী আছে!”

তিনি আরো দাবি করেন, আসু কখনই নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদ করার দাবিটাকে বাঙালি বিরোধী বা মুসলমান বিরোধীতার জন্য করেনি। অবৈধ বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করার জন্যই এই দাবী। ভট্টাচার্যর সংগঠন আসুর নেতৃত্বেই ৮০-র দশকে চলেছিল রক্তক্ষয়ী আসাম আন্দোলন – যার সমাপ্তি হয়েছিল ১৯৮৫ সালে আসাম চুক্তির মাধ্যমে। ওই চুক্তির একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদ করার প্রতিশ্রুতি।

যেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, সেই ২৫ মার্চকে ভিত্তি তারিখ ধরা হয় – অর্থাৎ তার আগে পর্যন্ত যারা আসামে এসেছেন, তাঁদের বৈধ ভারতীয় বলেই ধরা হবে। তার পরে আসা মানুষদের ঘোষণা করা হবে অবৈধ বিদেশী।

চুক্তির প্রায় তিন দশক পরে শুরু হয় নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদের সেই কাজ। প্রায় তিন বছর ধরে ৪০ হাজার কর্মী অফিসার নাগরিক পঞ্জী হালনাগাদের কাজ করেছেন সুপ্রীম কোর্টের নজরদারিতে।

আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জী প্রকাশের প্রধান অফিসার, প্রতীক হাজেলার কাছে বাংলাভাষীদের এই আশঙ্কার প্রসঙ্গ তুলেছিলাম

হাজেলা বলেন, “আশঙ্কা তো তখনই তৈরী হয় যদি কারও প্রতি অবিচার করা হয়। এক্ষেত্রে যারা নাগরিকত্বের জন্য নথিপ্রমাণ পেশ করতে পারেন নি, তাদের যদি তালিকার বাইরে রাখা হয়, তাহলে অবিচারটা হলো কোথায়? তাই আশঙ্কাই বা কেন তৈরী হবে? চূড়ান্ত খসড়ার পরেও যদি কোনও সত্যিকারের ভারতীয়র নাম বাদ যায়, তিনি তো একমাসের মধ্যে আবারও দাবি পেশ করতে পারবেন!”

নাগরিক পঞ্জী প্রকাশ নিয়ে আসামের বাংলাভাষী মুসলমান-হিন্দুদের যে আশঙ্কা অমূলক সেই কথাটা বলছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা ও লেখক হিরণ্য কুমার ভট্টাচার্য।

ভট্টাচার্যর কথায়, “যারা আশঙ্কার কথা বলছে, নিশ্চই তাদের আশঙ্কার কোনো কারণ রয়েছে। যদি সত্যিই কেউ ভারতীয় নাগরিক হয়, তাহলে কেন তারা ভয় পাবে? তাদের তো আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। আসলে নাগরিক পঞ্জী নিয়ে এই আশঙ্কা, আতঙ্ক এগুলো একটা স্বার্থান্বেষী মহল তৈরী করছে।”

“অসমীয়া বিরোধী একটা মহল তো সবসময়েই সক্রিয় যারা চায় না নাগরিক পঞ্জীর কাজ শেষ হোক। এই প্রক্রিয়া কখনই বাঙালিবিরোধী বা মুসলমানবিরোধী নয়।”

অন্যদিকে বাঙালি প্রধান বরাক উপত্যকার বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ মনে ঠিক বিপরীত ধারণাটাই রয়েছে।

কথা বলেছিলাম শিলচরের দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ কাগজের সম্পাদক তৈমূর রাজা চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, “আশঙ্কার কথা আমরা বলার থেকেও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হলো যে সরকার নিজেই তো বলছে সামরিক বাহিনী, পুলিশ নিয়ে যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলায় তারা তৈরী। তাতেই তো প্রমাণিত হয় যে তারাও আশঙ্কা করছেন যে কিছু একটা অঘটন ঘটছে আর মানুষ যদি প্রতিবাদ করেন, রাস্তায় নামেন, সেটা প্রতিহত করার জন্য প্রশাসনও তৈরী।”

“একটা ষড়যন্ত্র নিশ্চই চলছে। কারণ গত দুটো আদমশুমারিতে দেখা যাচ্ছে যে বাঙালীর সংখ্যা বেড়ে গেছে।”
“মূলত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাংলাভাষী হিন্দু আর তাদের থেকেও বেশী সংখ্যায় মুসলমানরা যারা নিজেদের মাতৃভাষাকে আগে অসমীয়া বলে উল্লেখ করত, তারা মার খেতে খেতে এখন বাধ্য হয়ে জনগণনায় নিজেদের মাতৃভাষা বাংলা বলে উল্লেখ করছে। তাই অসমীয়াদের মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরী হয়েছে যে বাঙালিরা না সংখ্যাগুরু হয়ে যায়,” বলছিলেন তৈমূর রাজা চৌধুরী।

এই নাগরিক পঞ্জী নিয়ে বাঙালি-অসমীয়া একপ্রকার বৈরিতা শুরু হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। কিন্তু গুয়াহাটির প্রবীণ সাংবাদিক ও অসমীয়া ভাষার সংবাদ চ্যানেল প্রাগ নিউজের প্রধান সম্পাদক অজিত ভুঁইঞার মতে বাঙালী-অসমীয়া বৈরিতা এখন প্রায় নেই।

তিনি বলছিলেন নাগরিক পঞ্জীর ইস্যুটাকে কাজে লাগাচ্ছে কিছু রাজনৈতিক নেতা।

“ঠিকই একটা সময়ে আমাদের মধ্যে একটা টেনশন ছিল। কিন্তু সেসব এখন অতীত। অসমীয়া সমাজ স্বীকার করে এরাজ্যে বাঙালীদের কন্ট্রিবিউশন। আসলে এই ইস্যুটাকে নিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ, যারা রাজনীতি করে, তারা বিষয়টাকে হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতিতে নিয়ে যাচ্ছে। এবং গোটা এন আর সি প্রকাশের ব্যাপারটাকেই বানচাল করে দিতে চাইছে। সেটা করতে পারলে তো রাজনীতির একটা চ্যাপ্টারই বন্ধ হয়ে যাবে।”

“একবার যদি বিদেশী চিহ্নিতকরণ হয়ে যায়, তাহলে কেউই তো আর মুসলিমদের বা বাঙালি হিন্দুদের ভোট ব্যাংক হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না। সেজন্যই খুব সুচিন্তিতভাবে এই আশঙ্কাটা তৈরী করা হয়েছে। ভয়ের বাতাবরণ তৈরী করা হয়েছে,” বলছিলেন ভুঁইঞা।

নাগরিক পঞ্জীর চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ নিয়ে বাংলাভাষী মানুষরা যেখানে বিদেশী বলে চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছেন আর অসমীয়ারা যেখানে বলছেন সত্যিকারের নাগরিক যেসব বাঙালী, তাদের আশঙ্কার কারণ নেই, সরকার আর পুলিশ প্রশাসনে ব্যস্ততা তুঙ্গে।
কথা বলেছিলাম আসাম পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান পল্লব ভট্টাচার্যের সঙ্গে।

ভট্টাচার্য জানাচ্ছিলেন, “আমরা বেশ কিছু এলাকা চিহ্নিত করেছি, যেখানে আইন শৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে। আসামে বেশ কিছু মৌলবাদী শক্তি তো সক্রিয়। নাগরিক পঞ্জী নিয়ে সেই সব শক্তির পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকেও বেশ কিছু সংগঠন এ নিয়ে আসরে নেমেছে। তাদের সবাইকেই নজরে রাখা হয়েছে। সেনা, আধাসামরিক বাহিনী আর পুলিশবাহিনীকে প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়াও আমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা সচেতনতা প্রচার চালাচ্ছি যে এন আর সি বেরুনো মানেই এটা নয় যে যাদের নাম বাদ যাবে তারা বিদেশী বলে চিহ্নিত হয়ে যাবে। দাবি পেশ করার এক মাস সময় আছে – এটাও প্রচার করছি আমরা।”

এইসবের মধ্যেই ৩০ জুলাই দিনের বেলায় প্রকাশিত হবে জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর চূড়ান্ত খসড়া। সেটা যেমন টাঙ্গিয়ে দেয়া হবে নাগরিকপঞ্জী সেবা কেন্দ্রগুলিতে, সেরকমই ওয়েবসাইটেও দেখা যাবে আর এস এম এস করেও জেনে নেওয়া যাবে নিজের নাম তালিকায় আছে কী না।

যাদের নাম এই তালিকায় থাকবে না, তারা এক মাস সময় পাবেন পুনরায় দাবি জানাতে।

তবে অনেকেই বলছেন, ইতিমধ্যেই সব নথি জমা করেও যদি নাম বাদ যায়, তাহলে পরের এক মাসে দাবি জানাতে নতুন আর কী নথি জমা দেয়া সম্ভব?

http://www.dailynayadiganta.com/subcontinent/336783