সদকায়ে ফিতর ও এর বিধান

আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা ৩০তম পারার সূরা আ’লা এর ১৪ ও ১৫ নং আয়াতে ইরশাদ করেন:
قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: নিশ্চয় লক্ষ্যবস্তু পর্যন্ত পৌঁছেছে, যে পবিত্র হয়েছে এবং স্বীয় প্রতিপালকের নাম নিয়ে নামায পড়েছে।
সদরুল আফাযিল হযরত আল্লামা মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ নঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী رَحْمَةُ اللهِ تَعَالٰى عَلَيْهِ “খাযায়িনুল ইরফানে” এই আয়াতে করীমার আলোকে লিখেন: এই আয়াতের তাফসীরে এ কথা বলা হয়েছে যে, “ تَزَكَّىٰ ّٰ ” দ্বারা ‘সদকায়ে ফিতর দেয়া’ এবং “প্রতিপালকে নাম নেওয়া” দ্বারা ‘ঈদগাহে যাওয়ার পথে তাকবীর বলা’ আর “নামায” দ্বারা ‘ঈদের নামায’কে বুঝানো হয়েছে। (খাযায়িনুল ইরফান, ১০৭৪ পৃষ্ঠা)

সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব

হুযুর পুরনূর صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিলেন যে, গিয়ে মক্কায়ে মুআয্‌যমার অলিগলিতে ঘোষণা করে দাও, “সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব।” (তিরমিযী, ২য় খন্ড, ১৫১ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৬৭৪)

সদকায়ে ফিতর অহেতুক কথাবার্তার কাফ্ফারা স্বরূপ

হযরত সায়্যিদুনা ইবনে আব্বাস رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ বলেন: আল্লাহর প্রিয় হাবীব, হাবিবে লবীব, রাসুলুল্লাহ صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم সদকায়ে ফিতর নির্ধারণ করেছেন, যেনো অনর্থক এবং অযথা কথাবার্তা থেকে রোযা পবিত্র (অর্থাৎ পরিছন্ন) হয়ে যায়। তাছাড়া মিসকিনদের খাবারের ব্যবস্থাও যেনো হয়ে যায়। (আবু দাউদ, ২য় খন্ড, ১৫৮ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ১৬০৯)

রোযা ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে

হযরত সায়্যিদুনা আনাস বিন মালিক رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ বলেন: মদীনার তাজেদার, হুযুরে আনওয়ার صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْهِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: যতক্ষণ পর্যন্ত সদকায়ে ফিতর আদায় করা না হয়, বান্দার রোযা যমীন ও আসমানের মাঝখানে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। (আল ফিরদাউস বিমাসুরিল খাত্তাব, ২য় খন্ড, ৩৯৫ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ৩৭৫৪)

ফিতরার ১৬টি মাদানী ফুল

﴾১﴿ সদকায়ে ফিতর ঐসকল মুসলমান পুরুষ ও নারীর উপর ওয়াজিব, যারা “নিসাবের অধিকারী” এবং তাদের নিসাব “হাজতে আসলিয়্যা” (জীবনের মৌলিক চাহিদা যেমন; অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি) এর অতিরিক্ত হয়। (আলমগীরী থেকে সংক্ষেপিত, ১ম খন্ড, ১৯১ পৃষ্ঠা)
﴾২﴿ যার নিকট সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ ভরি রূপা কিংবা সাড়ে ৫২ ভরি রূপার সমমূল্য টাকা বা এতো টাকা মূল্যের ব্যবসায়ীক পণ্য থাকে (আর এ সবই জীবনের মৌলিক চাহিদার অতিরিক্ত হয়) অথবা এতো টাকা মূল্যের জীবনের মৌলিক চাহিদার অতিরিক্ত মালপত্র থাকে, তাকে “নিসাবের অধিকারী” বলা হয়।” (১. নিসাবের অধিকারী, ধনী, ফক্বির ও হাজতে আসলিয়্যাহ ইত্যাদি পরিভাষার বিস্তারিত বিবরণ হানাফী ফিক্বাহ শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ কিতাব ‘বাহারে শরীয়াত’ ৫ম অধ্যায়ে দেখুন।)
﴾৩﴿ সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হওয়ার জন্য “বুদ্ধিমান ও প্রাপ্ত বয়স্ক” হওয়া শর্ত নয়। বরং শিশু কিংবা পাগলও যদি নিসাবের মালিক হয়, তবে তাদের সম্পদ থেকে তাদের অভিভাবক পরিশোধ করবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩য় খন্ড, ৩৬৫ পৃষ্ঠা)
সদকায়ে ফিতরের জন্য নিসাবের পরিমাণ তো হচ্ছে যাকাতের নিসাবের সমপরিমাণ যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে যে, সদকায়ে ফিতরের জন্য সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া ও বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত নয়। অনুরূপভাবে যে সমস্ত বস্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত (যেমন; প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোষাক, না সিলানো কাপড়, ঘরের আসবাবপত্র ইত্যাদি) এবং এর মূল্য নিসাব পরিমাণ পৌঁছায়, তবে সে সমস্ত বস্তুর কারণে সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হবে। (ওয়াকারুল ফাতাওয়া, ২য় খন্ড, ৩৮৫ পৃষ্ঠা)
﴾৪﴿ নিসাবের অধিকারী পুরুষের উপর নিজের পক্ষ থেকে, নিজের ছোট শিশুদের পক্ষ থেকে আর যদি কোন উন্মাদ (পাগল) সন্তান থাকে (ঐ পাগল সন্তানটি প্রাপ্ত বয়স্কই হোক না কেন) তার পক্ষ থেকেও সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব, অবশ্য ঐ শিশু বা পাগল যদি নিজেই নিসাবের অধিকারী হয়, তবে তার সম্পদ থেকে ফিতরা পরিশোধ করবে। (আলমগীরী, ১ম খন্ড, ১৯২ পৃষ্ঠা)
﴾৫﴿ পুরুষ নিসাবের অধিকারীর উপর তার স্ত্রী কিংবা মাতাপিতা অথবা ছোট ভাইবোন ও অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের ফিতরা ওয়াজিব নয়। (প্রাগুক্ত, ১৯৩ পৃষ্ঠা)
﴾৬﴿ পিতা না থাকলে দাদা পিতার স্থলাভিষিক্ত। অর্থাৎ আপন গরীব ও এতিম নাতি-নাতনির পক্ষ থেকে তার উপর সদকায়ে ফিতর দেয়া ওয়াজিব। (দুররে মুখতার, ৩য় খন্ড, ৩৬৭ পৃষ্ঠা)
﴾৭﴿ মায়ের উপর তার ছোট শিশুর পক্ষ থেকে সদকায়ে ফিতর দেয়া ওয়াজিব নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩য় খন্ড, ৩৬৭ পৃষ্ঠা)
﴾৮﴿ পিতার উপর তার সজ্ঞান ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সদকায়ে ফিতর দেয়া ওয়াজিব নয়। (রদ্দুল মুহতার সম্বলিত দুররে মুখতার, ৩য় খন্ড, ৩৭০ পৃষ্ঠা)
﴾৯﴿ কোন শরয়ী অপারগতার কারণে রোযা রাখতে পারলোনা বা আল্লাহর পানাহ! কোন অপারগতা ছাড়াই রমযানুল মোবারকের রোযা রাখলো না, তার উপরও নিসাবের অধিকারী হওয়ার অবস্থায় সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার, ৩য় খন্ড, ৩৬৭ পৃষ্ঠা)
﴾১০﴿ স্ত্রী বা প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান, যাদের ভারণপোষণ ইত্যাদি যে ব্যক্তির দায়িত্বে রয়েছে, সে যদি তাদের অনুমতি ব্যতিত তাদের ফিতরা পরিশোধ করে দেয়, তবে আদায় হয়ে যাবে। হ্যাঁ যদি ভরণপোষণ তার দায়িত্বে না থাকে, যেমন; প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বিয়ে করে আলাদা ঘরে বসবাস করে এবং নিজের ব্যয় নিজেই বহন করে, তবে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব তার নিজের দায়িত্বেই হয়ে গেলো। সুতরাং এমন সন্তানের পক্ষ থেকে তার অনুমতি ছাড়া ফিতরা দিলে তা আদায় হবে না।
﴾১১﴿ স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া যদি ফিতরা পরিশোধ করে দেয়, তবে আদায় হবে না। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ৩৯৮ পৃষ্ঠা)
﴾১২﴿ ঈদুল ফিতরের সুবহে সাদিকের সময় যে নিসাবের অধিকারী ছিলো, তার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব, যদি সুবহে সাদিকের পর নিসাবের অধিকারী হয়, তবে ওয়াজিব নয়। (আলমগীরী থেকে সংক্ষেপিত, ১ম খন্ড, ১৯২ পৃষ্ঠা)
﴾১৩﴿ সদকায়ে ফিতর আদায় করার উত্তম সময় হচ্ছে, ঈদের দিন সুবহে সাদিকের পর থেকে ঈদের নামায আদায় করার পূর্বে আদায় করা, যদি চাঁদ রাত কিংবা রমযানুল মোবারকের যেকোন দিন বরং রমযান শরীফের পূর্বেও যদি কেউ আদায় করে দেয়, তবুও ফিতরা আদায় হয়ে যাবে এবং এরূপ করা একেবারে জায়িয। (আলমগীরী থেকে সংক্ষেপিত, ১ম খন্ড, ১৯২ পৃষ্ঠা)
﴾১৪﴿ যদি ঈদের দিন অতিবাহিত হয়ে যায় এবং ফিতরা আদায় করেনি, তবুও ফিতরা রহিত হয়ে যাবে না; বরং সারা জীবনে যখনই পরিশোধ করবে, তা আদায় হবে। (আলমগীরী থেকে সংক্ষেপিত, ১ম খন্ড, ১৯২ পৃষ্ঠা)
﴾১৫﴿ সদকায়ে ফিতর নেয়ার উপযুক্ত সেই, যে যাকাত নেয়ার উপযুক্ত। অর্থাৎ যাকে যাকাত দেয়া যাবে, তাকে ফিতরাও দেয়া যাবে এবং যাকে যাকাত দেয়া যাবে না তাকে ফিতরাও দেয়া যাবে না। (আলমগীরী থেকে সংক্ষেপিত, ১ম খন্ড, ১৯৪ পৃষ্ঠা)
﴾১৬﴿ সৈয়দ বংশীয়দেরকে সদকায়ে ফিতর দেয়া যাবে না। কেননা তারা হচ্ছে বণী হাশিম গোত্রের। বাহারে শরীয়াত ১ম খন্ডের ৯৩১ পৃষ্ঠায় রয়েছে: বনী হাশিমদেরকে যাকাত (ফিতরা) দেয়া যাবে না। অন্য কেউ তাদের দিতে পারবে না, এক হাশেমী অপর হাশেমীকেও দিতে পারবে না। বনী হাশিম দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, হযরত আলী, জাফর, আকিল এবং হযরত আব্বাস ও হারিস বিন আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানেরা।

সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ

গম বা এর আটা অথবা গমের ছাতু আধা সা’ (অর্থাৎ দু’কেজি থেকে ৮০ গ্রাম কম) বা এর মূল্য, খেজুর বা মুনাক্কা (বড় কিসমিস) অথবা যব কিংবা এর আটা বা যবের ছাতু এক সা’ (অর্থাৎ চার কেজি থেকে ১৬০ গ্রাম কম) অথবা এর মূল্য, এটি হচ্ছে একটি সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ। (আলমগীরী, ১ম খন্ড, ১৯১ পৃষ্ঠা। দুররে মুখতার, ৩ খন্ড, ৩৭২ পৃষ্ঠা) বাহারে শরীয়াতে রয়েছে: উচ্চ পর্যায়ের বিশ্লেষণ এবং সতর্কতা হলো: এক সা’ ওজনের মূল্য তিনশত একান্ন টাকা (৩৫১) সমমান এবং আধা সা’ ওজনের মূল্য একশত পচাঁত্তর টাকা পঞ্চাশ পয়সা (১৭৫.৫০) সমমানের উপর। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ৯৩৯ পৃষ্ঠা)
এই চারটি বস্তু ছাড়া যদি অপর কোন বস্তু দ্বারা ফিতরা আদায় করতে চায়, যেমন; চাউল, ভুট্টা, বাজরা (এক প্রকার শষ্য) বা অন্য কোন শষ্য বা কোন বস্তু দ্বারা দিতে চাইলে, তবে এর মূল্যে সাথে তুলনা করতে হবে অর্থাৎ সেই বস্তু আধা সা’ গম বা এক সা’ যবের সমমূল্যের হতে হবে, এমনকি যদি রুটি দেয় তবে এতেও মূল্যের তুলনা করতে হবে যদিওবা গম বা যবের রুটি হোক না কেন। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ৯৩৯ পৃষ্ঠা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *