কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে যাকাত

>>> কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে যাকাত <<<

زكاة যাকাত শব্দটি (ز ك و) ধাতু থেকে এসেছে। যার অর্থ বৃদ্ধি, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা। যাকাত শব্দের (form I verb Past) হল زَكَىٰ (যাকায়া) যার অর্থ হল বৃদ্ধি পাওয়া, বর্ধিত হওয়া, পবিত্র হওয়া, সঠিক হওয়া। এর (form II verb Past) হল زَكَّىٰ(যাক্কা) যার অর্থ পবিত্র করা, পবিত্র বলা, বৃদ্ধি করা, সঠিক বলা, ভাল বলা, প্রশংসা করা, সুপারিশ করা, যাকাত আদায় করা। এর (form V verb Past) হল تَزَكَّىٰ (তাযাক্কা) যার অর্থ শোধিত হওয়া, পবিত্র হওয়া, বর্ধিত হওয়া, যাকাত দেওয়া, এর noun (أَزْكَىٰ) (আযকায়া) অর্থ অধিকতর পরিচ্ছন্ন, পবিত্রতর, পবিত্রতার জন্য অধিকতর সহায়ক, এর noun زَكِيّ (যাকী) যার অর্থ পবিত্র, নির্দোষ, সৎ, ন্যায়পরায়ন।

ইসলামি পরিভাষায় যাকাত বলা হয়, শরিয়তের নির্দেশ অনুযায়ী স্বীয় মালের একটা নির্ধারিত অংশ তার হকদারদের মাঝে বন্টন করা এবং তার আয় হতে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা।

যে যাকাত আল্লাহ বিধিবদ্ধ করেছেন তা হল। (১) সম্পদে ফরজ যাকাত। ও (২) দায়িত্বে ফরজ যাকাত যাকে যাকাতুল ফিতর বা ফিতরা বলা হয়, যা প্রতিটি মুসলিমের উপর রমজান মাসের শেষে আদায় করা ফরজ হয়।

চার প্রকার সম্পদের উপর যাকাত ফরয।

(ক) সোনা ও রুপা এবং সঞ্চিত অর্থের যাকাত।

(খ) জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের যাকাত যাকে ওশর বলা হয়।

(গ) “বাহিমাতুল আন‘আম” তথা উট, গরু, দুম্বা-ভেড়া ও ছাগল এর যাকাত।

(ঘ) ব্যবসা সামগ্রীর যাকাত।

>>> যাকাত ইসলামের ভিত্তি <<<

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الإِسْلاَمُ أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَتُقِيمَ الصَّلاَةَ وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ وَتَصُومَ رَمَضَانَ وَتَحُجَّ الْبَيْتَ

ইসলাম হলো- তুমি সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন ইলাহ নেই আর অবশ্যই মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রমযানের সিয়াম পালন করবে, বায়তুল্লাহ পৌঁছার সামর্থ্য থাকলে হাজ্জ করবে। সহীহ মুসলিম: হাদীস নং-১

>>> যাকাত পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে <<<

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلاتَكَ سَكَنٌ لَهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

তাদের সম্পদ থেকে সাদাকাহ (যাকাত) গ্রহণ কর যাতে তা দিয়ে তুমি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করতে পারো আর তুমি তাদের জন্য দো‘আ কর, নিঃসন্দেহে তোমার দু‘আ হচ্ছে তাদের জন্য প্রশান্তিকর আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। তারা কি জানে না যে নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং সদাকাহ গ্রহণ করেন আর নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। আত্-তাওবাহ, ৯/১০৩-১০৪

>>>> যাকাত সম্পদ বৃদ্ধি করে <<<

وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ رِبًا لِيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلا يَرْبُو عِنْدَ اللَّهِ وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ

আর তোমরা রিবায় (সুদে) যা কিছু দিয়ে থাকো, মানুষের ধন-সম্পদে যেন তোমাদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পায়, আসলে আল্লাহর নিকটে তা বৃদ্ধি পায় না আর আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাকো প্রকৃতপক্ষে তারাই বহুগুণ সম্পদ লাভ করে। আর-রূম, ৩০/৩৯

لَيْسَ عَلَيْكَ هُدَاهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَلأنْفُسِكُمْ وَمَا تُنْفِقُونَ إِلا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لا تُظْلَمُونَ

তাদেরকে হিদায়াত করার দায়িত্ব তোমার নয়, কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে হিদায়াত করেন এবং তোমরা যে সম্পদ ব্যয় কর তা তোমাদের নিজেদের জন্যই আর তোমরা তো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যয় করে থাকো এবং তোমরা হালাল সম্পদ হতে যা ব্যয় করবে তা তোমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে আর তোমাদের প্রতি যুলম করা হবে না। আল-বাকারাহ, ২/২৭২

>>> সম্পদশালীদের জন্য যাকাত আদায় করা ফরয <<<

وَأَقِيمُوا الصَّلاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَمَا تُقَدِّمُوا لأنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

আর তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত প্রদান কর এবং তোমরা নিজেদের জন্য যে নেক আমল আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর নিকট পাবে, তোমরা যা করছো নিশ্চয় আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। আল-বাকারাহ, ২/১১০

لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ

তোমরা কক্ষনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা যা ভালবাস তা থেকে ব্যয় করবে আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে জ্ঞাত আছেন। আলে‘ইমরান, ৩/৯২

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মু’আয ইবনু জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-কে ইয়ামানের (শাসক নিয়োগ করে) পাঠানোর সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছিলেন,

"‏ إِنَّكَ سَتَأْتِي قَوْمًا أَهْلَ كِتَابٍ، فَإِذَا جِئْتَهُمْ فَادْعُهُمْ إِلَى أَنْ يَشْهَدُوا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لَكَ بِذَلِكَ، فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لَكَ بِذَلِكَ فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ،

তুমি আহলে কিতাবের কাছে যাচ্ছো। কাজেই তাদের কাছে যখন পৌঁছবে তখন তাদেরকে এ কথার দিকে দাওয়াত দিবে যেন তারা সাক্ষ্য দিয়ে বলে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। যদি তারা তোমার এ কথা মেনে নেয় তবে তাদের বলবে যে, আল্লাহ তাদের উপর দিনে রাতে পাঁচ ওয়াক্ত স্বলাত ফরয করেছেন। যদি তারা এ কথাও মেনে নেয় তবে তাদের বলবে যে, আল্লাহ তাদের উপর সাদকা (যাকাত) ফরয করেছেন- যা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে এবং অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হবে। সহীহুল বুখারী: ১৩৯৫, ১৪৯৬

>>> মুমিনরাই যাকাত আদায় করে <<<

الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ

যারা সালাত কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে আর তারাই আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে। লুকমান। ৩১/৪, আন্‌-নামাল, ২৭/৩

رِجَالٌ لا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالأبْصَارُ

সেইসব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয় বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান হতে বিরত রাখে না, তারা সেদিনকে ভয় করে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। আন-নূর, ২৪/৩৭

الَّذِينَ لا يُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ

যারা যাকাত দেয় না আর তারাই আখিরাতকে অস্বীকারকারী। ফুসসিলাত, ৪১/৭

>>> সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতে হবে <<<

وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلاةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِنْدَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا

আর সে তার পরিবার-পরিজনকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তার রবের সন্তোষভাজন। মারইয়াম, ১৯/৫৫

>>> তাদের প্রতিদান <<<

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ

নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজসমূহ করেছে ও সালাত প্রতিষ্ঠা করেছে এবং যাকাত প্রদান করেছে, তাদের জন্য তাদের পুরষ্কার তাদের রবের নিকটে রয়েছে, এবং তাদের কোন ভয় নেই আর তারা চিন্তিত হবে না। আল-বাকারাহ, ২/২৭৭

الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ سِرًّا وَعَلانِيَةً فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ

যারা নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে ফলে তাদের জন্য তাদের রবের নিকট তাদের প্রতিদান রয়েছে এবং তাদের কোন ভয় নেই আর তারা চিন্তিত হবে না। আল-বাকারাহ, ২/২৭৪

>>> যাকাতের হকদার <<<

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَاِبْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

নিশ্চয় সাদাকাহ (যাকাত) হচ্ছে গরীবদের জন্য ও অভাবগ্রস্তদের জন্য আর এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য ও (দীনের প্রতি) তাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে ও দাস আযাদ করার ক্ষেত্রে ও ঋণগ্রস্তদের সাহায্যার্থে ও আল্লাহর পথে (অর্থাৎ জিহাদে) এবং মুসাফিরদের সাহায্যার্থে, এই হুকুম আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, অতি প্রজ্ঞাময়। আত্-তাওবাহ, ৯/৬০

لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الأرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُمْ بِسِيمَاهُمْ لا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ

সদাকাহ ঐ সব লোকেদের জন্য যারা আল্লাহর পথে আবদ্ধ হয়ে গেছে, জীবিকার সন্ধানে জমিনে ঘোরাফিরা করতে সক্ষম নয়, না চাওয়ার কারণে অনবগত লোকেরা তাদেরকে সচ্ছল মনে করে, তুমি তাদেরকে তাদের লক্ষণ দ্বারা চিনবে, তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে চায় না এবং তোমরা সম্পদ থেকে যা ব্যয় কর অবশ্যই আল্লাহ সে সম্পর্কে ভালভাবে অবগত আছেন। আল-বাকারাহ, ২/২৭৩

>>> যাকাত ফরজ হওয়ার সময় <<<

ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مَنْ اسْتَفَادَ مَالًا فَلَا زَكَاةَ عَلَيْهِ حَتَّى يَحُولَ عَلَيْهِ الْحَوْلُ

কারো অর্জিত সম্পদে যাকাত নেই যতক্ষণ না তার উপর এক বছর অতিবাহিত হয়। (আত-তিরমিযী)

>>> যাকাতের নিসাব <<<

আবূ সা‘ঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسَةِ أَوْسُقٍ مِنَ التَّمْرِ صَدَقَةٌ، وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ أَوَاقٍ مِنَ الْوَرِقِ صَدَقَةٌ، وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ ذَوْدٍ مِنَ الإِبِلِ صَدَقَةٌ

পাঁচ ওসাকের কম পরিমাণ খেজুরের যাকাত নেই। পাঁচ ওকিয়ার কম পরিমাণ রুপার যাকাত নেই এবং পাঁচটির কম উটের যাকাত নেই। সহীহুল বুখারী: ১৪৫৯

(১) ৬০ সা-এ এক ওয়াসাক হয়। আর এক সা সমান দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম সে হিসাব অনুযায়ী মোটামুটি ৫ ওয়াসাক সমান ২০ মণ। অর্থাৎ উৎপাদিত খেজুর ২০ মণ হলে তার উপর যাকাত ফরজ হয়, এর কম হলে যাকাত ফরজ হবে না।

(২) ৪০ দিরহামে হয় এক উকিয়া। ৫ উকিয়া সমান ২০০ দিরহাম। ২০০ দিরহাম সমান সাড়ে বায়ান্ন তোলা। এর কম পরিমাণ রুপার যাকাত ফরজ হয় না।

(৩) যাউদ, তিন হতে দশ পর্যন্ত উটের পালকে যাউদ বলে। এখানে হাদীসের মর্ম এই যে, ৫টি উটের কমে যাকাত ফরজ হয় না। যা অন্যান্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন গরু ৩০টির কম, ছাগল-ভেড়া ৪০ টির কমে যাকাত ফরজ হয় না।

>>> সোনা-রুপার যাকাত <<<

স্বর্ণ- রৌপ্যের ওপর নিসাব পরিমাণ হলে সর্বাবস্থায় যাকাত ফরজ। আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لأنْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ

এবং যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে আর তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে, অতঃপর তা দ্বারা তাদের কপালে, পার্শ্বে এবং পিঠে সেঁক দেয়া হবে। (আর সেদিন বলা হবে), এগুলো তাই যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে, সুতরাং তোমরা যা জমা করেছিলে তার স্বাদ উপভোগ কর। আত্-তাওবা, ৯/৩৪-৩৫

আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

فَإِذَا كَانَتْ لَكَ مِائَتَا دِرْهَمٍ وَحَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ فَفِيهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ وَلَيْسَ عَلَيْكَ شَيْءٌ يَعْنِي فِي الذَّهَبِ حَتَّى يَكُونَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا فَإِذَا كَانَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا وَحَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ فَفِيهَا نِصْفُ دِينَارٍ فَمَا زَادَ فَبِحِسَابِ ذَلِكَ

যখন তোমার নিকট দু’শত দিরহাম ( সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা) জমা হয় এবং একটি বছর তার উপর পূর্ণ হবে, তখন তাতে ৫ দিরহাম যাকাত দিতে হবে আর তোমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত যাকাত দিতে হবে না যতক্ষণ না তোমার নিকট ২০টি দীনার (সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ) জমা হওয়ার পর এক বছর পূর্ণ হবে। এতে তোমাকে দিতে হবে (৪০ ভাগের এক ভাগ) অর্ধ দীনার আর এর অধিক হলে, ঐ অনুপাতে হিসাব করে যাকাত দিতে হবে। (আবূ দাউদ)

>>> ওশর বা উৎপাদিত ফসলের যাকাত <<<

ওশর: عُشْرٌ ওশর এর অর্থ হচ্ছে উৎপন্ন শস্যের এক দশমাংশ দান করা। অর্থাৎ বৃষ্টির পানিতে ও বিনা সেচে উৎপাদিত শস্যের দশ ভাগের এক ভাগ বা বিশ মণে দুই মণ, আর সেচের মাধ্যমে উৎপাদিত হলে নিসফ ওশর বা বিশ মণে এক মণ বর্ণিত নিয়মানুসারে যাকাত বা ওশর দিতে হবে। আর আল্লাহ বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الأرْضِ وَلا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنْفِقُونَ وَلَسْتُمْ بِآخِذِيهِ إِلا أَنْ تُغْمِضُوا فِيهِ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ

হে মুমিনগণ! তোমাদের উপার্জিত উত্তম সম্পদ থেকে এবং তোমাদের জন্য ভূমি হতে আমি যা উৎপন্ন করেছি, তা থেকে তোমরা ব্যয় কর এবং নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করার মনস্থ করো না অথচ চোখ বন্ধ করা ছাড়া তোমরা তা গ্রহণ করো না আর জেনে রাখ, আল্লাহ মহাসম্পদশালী, প্রশংসিত। আল-বাকারাহ, ২/২৬৭

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسَةِ أَوْسُقٍ صَدَقَةٌ

পাঁচ ওয়াসক এর কম পরিমাণ উৎপন্ন ফসলের উপর সাদকা (অর্থাৎ উশর/নিসফে উশর) নেই। সহীহুল বুখারী: ১৪৪৭

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

فِيمَا سَقَتْ السَّمَاءُ وَالْعُيُونُ أَوْ كَانَ عَثَرِيًّا الْعُشْرُ وَمَا سُقِيَ بِالنَّضْحِ نِصْفُ الْعُشْرِ.

যে জমি আসমানের পানি এবং নদী খাল বিল প্রভৃতির পানি দ্বারা সিক্ত হয়েছে অথবা যে জমির মাটি খুব উর্বর ও রসালো, সে জমিতে উৎপাদিত ফসলের এক দশমাংশ ওশর দিতে হবে। আর যে জমিতে পানি সিঞ্চন করতে হয় তা হতে উৎপাদিত ফসলের বিশভাগের এক ভাগ অর্থাৎ অর্ধ ওশর দিতে হবে। সহীহুল বুখারী: ১৪৮৩

>>> যাকাতুল ফিতর <<<

যাকাতুল ফিতর বা ফিতরা হলঃ রমজানের রোজার শেষে প্রতিটি মুসলিমের উপর যে যাকাত ফরয হয় তাকে ফিতরা বলা হয়। হাদীসে এর নাম সদাকাতুল ফিতর ও যাকাতুল ফিতর উভয়ই পাওয়া যায়। এটি শরীরের যাকাত, এর উদ্দেশ্য হল রমযানের নিরর্থক কথা ও অশ্লীল আচরণ থেকে পবিত্র করা এবং মিসকিনদের খাদ্য প্রদান করা। খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ফিতরা প্রদান করাই হল রাসূলের সুন্নাত। আবূ সা’ঈদ খূদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

يَوْمَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ‏.‏ وَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ وَكَانَ طَعَامَنَا الشَّعِيرُ وَالزَّبِيبُ وَالأَقِطُ وَالتَّمْرُ

আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ঈদের দিন এক সা‘ পরিমাণ খাদ্য সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে আদায় করতাম। আবূ সা’ঈদ আরও বলেন, আমাদের খাদ্যদ্রব্য ছিল যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর। সহীহুল বুখারী: ১৫১০

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ، أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ عَلَى الْعَبْدِ وَالْحُرِّ، وَالذَّكَرِ وَالأُنْثَى، وَالصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ، وَأَمَرَ بِهَا أَنْ تُؤَدَّى قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلاَةِ

প্রত্যেক গোলাম, আযাদ, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমের উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতুল ফিতর হিসাবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক সা‘ পরিমাণ আদায় করা ফরয করেছেন এবং লোকজনের ঈদের স্বলাতে বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। সহীহুল বুখারী: ১৫০৩

ইবনু উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

فَرَضَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَدَقَةَ الْفِطْرِ ـ أَوْ قَالَ رَمَضَانَ ـ عَلَى الذَّكَرِ وَالأُنْثَى، وَالْحُرِّ وَالْمَمْلُوكِ، صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ، فَعَدَلَ النَّاسُ بِهِ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ‏.‏ فَكَانَ ابْنُ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ يُعْطِي التَّمْرَ، فَأَعْوَزَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ مِنَ التَّمْرِ فَأَعْطَى شَعِيرًا، فَكَانَ ابْنُ عُمَرَ يُعْطِي عَنِ الصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ، حَتَّى إِنْ كَانَ يُعْطِي عَنْ بَنِيَّ، وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ يُعْطِيهَا الَّذِينَ يَقْبَلُونَهَا، وَكَانُوا يُعْطُونَ قَبْلَ الْفِطْرِ بِيَوْمٍ أَوْ يَوْمَيْنِ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক পুরুষ, মহিলা, আযাদ ও গোলামের পক্ষ থেকে সদাকাতুল ফিতর অথবা বলেছেন সদাকা-ই-রমাদ্বন হিসাবে এক সা‘ খেজুর বা এক সা‘ যব আদায় করা ফরয করেছেন। তারপর লোকেরা অর্ধ সা‘ গমকে এক সা‘ খেজুরের সমমান দিতে লাগল। (রাবী নাফি’ বলেন) ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু খেজুর (সদাকাতুল ফিতর হিসাবে) দিতেন। এক সময় মাদীনায় খেজুর দুর্লভ হলে যব দিয়ে তা আদায় করেন। অতঃপর ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু প্রাপ্ত বয়স্ক ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক সকলের পক্ষ থেকেই সদাকাতুল ফিতর আদায় করতেন, এমনকি আমার সন্তানদের পক্ষ থেকেও সদাকার দ্রব্য গ্রহীতাদেরকে দিয়ে দিতেন এবং ঈদের এক-দু’ দিন পূর্বেই আদায় করে দিতেন। সহীহুল বুখারী: ১৫১১

সুতরাং আমাদের সকলেরই উচিত খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা। টাকা বা অর্থের দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীরা ফিতরা আদায় করেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *