আল্লাহর যিকির করা

>>> আল্লাহর যিকির করা <<< আল্লাহ বলেন;
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে তাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ; আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়। (আর-রাদ, ১৩/২৮)
যিক্‌র আরবী শব্দ। এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে ১) মুখ থেকে যা উচ্চারণ করা হয়। ২) অন্তরে কোন কিছু স্মরণ করা। ৩) কোন জিনিস সম্পর্কে সতর্ক করা। শর‘য়ী পরিভাষায় যিক্‌র হচ্ছে বান্দা তার রবকে স্মরণ করা। হোক তা তাঁর নাম নিয়ে, গুণ নিয়ে, তাঁর কাজ নিয়ে, প্রশংসা করে, তাঁর কিতাব তিলাওয়াত করে, তাঁর একত্ববাদ ঘোষণা করে, তাঁর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে অথবা তাঁর কাছে কিছু চেয়ে।
.
যিক্‌র দুই প্রকার। যথা; ১) কওলী বা কথার মাধ্যমে যিক্‌র এবং ২) আমলী বা কাজের মাধ্যমে যিক্‌র। প্রথম প্রকার যিক্‌রের মধ্যে রয়েছে; কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও সিফাতসমূহের আলোচনা ও স্মরণ, তাঁর একত্ববাদ ঘোষণা ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় প্রকারে রয়েছে; দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা ও শিক্ষা দেয়া, আল্লাহর হুকুম-আহ্কম ও আদেশ-নিষেধ মেনে চলা ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন;
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلا تَكْفُرُونِ
কাজেই তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব আর আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও আর অকৃতজ্ঞ হয়ো না। (আল-বাকারাহ, ২/১৫২)
لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও অবশ্যই আমি তোমাদেরকে আরো বেশী দেব, আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর। (ইব্রাহীম, ১৪/৭)
.
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন;
الشَّيْطَانُ جَاثِمٌ عَلٰى قَلْبِ ابْنِ اٰدَمَ فَإِذَا ذَكَرَ اللّٰهَ خَنَسَ وَإِذَا غَفَلَ وَسْوَسَ
শয়তান আদম সন্তানের ক্বলবের বা অন্তরের উপর জেঁকে বসে থাকে। যখন সে আল্লাহর স্মরণ বা যিক্‌র করে করে তখন সরে যায় আর যখন গাফিল বা অমনোযোগী হয় তখন শয়তান তার দিলে ওয়াস্ওয়াসা দিতে থাকে। (মিশকাতুল মাসাবীহ: ২২৮১)
.
আবূ মূসা হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন;
مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّه وَالَّذِي لاَ يَذْكُرُ رَبَّه مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ
যে ব্যক্তি তার প্রভুর স্মরণ বা যিক্‌র করে, আর যে যিক্‌র করে না, তাদের উদাহরণ হলো জীবিত ও মৃত ব্যক্তির ন্যায়। (সহীহুল বুখারী: ৬৪০৭)
.
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন;
مَنْ قَالَ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ‏.‏ فِي يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ حُطَّتْ خَطَايَاهُ، وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ
যে ব্যক্তি প্রতিদিন একশ’বার ‘সুবাহানাল্লাহি ওয়া বিহামদি’ বলবে তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয়। (সহীহুল বুখারী: ৬৪০৫)
.
আবূ মালেক আল-হারেস ইবনু আসেম আল-আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন:
الطُّهُورُ شَطْرُ الإِيمَانِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ تَمْلأُ الْمِيزَانَ ‏.‏ وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ تَمْلآنِ – أَوْ تَمْلأُ – مَا بَيْنَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَالصَّلاَةُ نُورٌ وَالصَّدَقَةُ بُرْهَانٌ وَالصَّبْرُ ضِيَاءٌ وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ كُلُّ النَّاسِ يَغْدُو فَبَائِعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا أَوْ مُوبِقُهَا
পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক; আল-হামদুলিল্লাহ্ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য) [বললে] পাল্লা পরিপূর্ণ করে দেয় এবং “সুবহানাল্লাহ ওয়াল-হামদুলিল্লাহ” (পবিত্রতা ও মহিমা আল্লাহর এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য) উভয়ে অথবা এর একটি আসমান ও যমীনের মাঝখান পূর্ণ করে দেয়। স্বলাত হচ্ছে (নূর) আলো। সাদকা হচ্ছে প্রমাণিকা/দলিল। ধৈর্য হল জ্যোতি। আর কুরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলিল। প্রত্যেক ব্যক্তি আপন আত্মার ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে সকাল শুরু করে আর তা হয় তাকে মুক্ত করে দেয় অথবা তাকে ধ্বংস করে দেয়। (মুসলিম: ৪২২)

রাসূল (সঃ)-এর জীবনী

আমরা এ পর্যন্ত মুহাম্মদ (সঃ)-এর ‘জন্মের পর থেকে নবুয়্যাতের আগ পর্যন্ত’ শিরোনামে তাঁর জীবনের নবুয়্যাতের আগ পর্যন্ত নানা দিক সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। যাকে প্রেরণের উদ্দেশ্যই ছিল বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবতার সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। তৎকালীন অশান্তময় পৃথিবীতে যার আগমন ছিল দুনিয়ায় বসবাসকারী মানুষের প্রতি বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহর পরম আশীর্বাদ স্বরূপ।

বিপর্যস্ত মানুষের শান্তি তথা বিশ্ব শান্তির জন্য যাকে প্রেরণ করে আল্লাহ পাক নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন,“আমি তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি।” যাঁর আগমনের পূর্বাভাষও শুরু হয়ে ছিল অসংখ্য কল্যাণময় দিক নিয়ে যেমন, তাঁর জন্মের ৫০ দিন পূর্বে আল্লাহ আক্রমণকারী ইয়ামানের শক্তিশালী বাদশাহ আব্রাহা তার সৈন্যসহ সমূলে ধ্বংস হয়েছিল।

মক্কায় তখন মহা দুর্ভিক্ষ চলছিল, তিনি তাঁর মায়ের গর্ভে আসার সাথেই দুর্ভিক্ষ অবসান হতে লাগল। হারিয়ে যাওয়া যমযম কূপের সন্ধান পাওয়া গেল। তাঁর মা জননী আমেনা বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ তার পেটে অবস্থান নেয়ার সাথেই সারা বিশ্বে আলোক রশ্মি ছড়িয়ে পড়ল, যার সাহায্যে তিনি সুদূর সিরিয়ার রাজ প্রাসাদসমূহ পরিস্কার দেখতে ছিলেন।

এমনিভাবে আরও অসংখ্য ঘটনা পৃথিবীতে ঘটতে ছিল। অতঃপর তিনি যখন জন্মগ্রহণ করলেন, মক্কায় তখন ভূ-কম্প দ্বারা মূর্তি গুলো ভেঙ্গে চুরমার হতে লাগল। জ্বিনদের আসমান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল। অপর দিকে পারস্য সম্রাটের রাজমহলে ভূ-কম্পনের আঘাতে রাজমহলের ১৪টি স্তম্ভ ধ্বসে পড়ে ছিল। এক দিকে শান্তির আগমন অপর দিকে বাতিলের মাথায় আঘাত। তাইত আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন,“ আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর ফলে সত্য মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।”( আম্বিয়া-১৮)।

জন্মের পর যেখানেই তাঁর অবস্থান সেখানেই কল্যাণের জোয়ার। হালিমা সা’দিয়া বর্ণনা করেন, আমি এতটা অসহায় ছিলাম যে, আমার উটে দুধ ছিলনা। খাদ্যাভাবে খুবই দুর্বল ছিল, আমার নিজের সন্তান দুধের অভাবে হীনবল হয়ে পড়ে ছিল। এমনই এক করূণ পরিস্থিতিতে কোন ধনী লোকের সন্তান লালন-পালনের জন্য যখন কেউ আমাকে পছন্দ করলনা, তখন অনন্যপায় হয়ে এতিম শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গ্রহণ করলাম। তাঁকে গ্রহণ করার সাথে সাথেই আমার দৈন্য দশা দূর হতে লাগল। আমার উট শক্তিশালী হয়ে সবার আগে চলতে লাগল। আমার ফসলাদি থেকে আরম্ভ করে সব কিছুতেই বরকত হতে লাগল। এমন কি বনী-সা’য়াদ গোত্রের প্রত্যেকের ঘর থেকে সু-ঘ্রাণ বাহির হতে লাগল। এমনিভাবে আরও নানা ধরনের বরকত বিশ্ববাসী উপলব্ধি করতে ছিল।

এসবই ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য বিশেষ রহমত ও সহযোগিতা। মানব জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত হল মানব জীবনকে ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়ে তোলা এবং সমাজ ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে ভারসাম্য ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করা। মানব জাতির ত্রাণকর্তা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন সে কাজটি শুরু করেছিলেন শিশু কাল থেকেই।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুধ মাতা হালিমা সা’দিয়া বর্ণনা করেন, শিশুকালে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কখনও আমার দুটি স্তন পান করাতে পারিনি। সব সময় একটি স্তন থেকে দুধ পান করেছেন, অপরটি তাঁর দুধ ভাইয়ের জন্য রেখেছেন। মানবাধিকারের প্রতি আল্লাহ পাকের যে নির্দেশ “তোমরা পরস্পরের অধিকার ক্ষুন্ন করোনা” তা যেন তিনি শিশু কাল থেকেই বাস্তবায়ন শুরু করেছিলেন। ১৭ বছর বয়সে তরুণ মুহাম্মদ ওকাজের মেলায় সংগঠিত তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। অন্যায়ভাবে এ যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল কুরাইশদের ওপর।

ইতিহাসে যাকে “র্হাবে ফুজ্জার” তথা অন্যায় যুদ্ধ নামে খ্যাত। বাধ্য হয়েই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। স্বক্রিয়ভাবে তিনি আক্রমন করেননি। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এটাই তাঁর জীবনে প্রথম। সে যুগে আরবদের মধ্যে যে, নিষ্ঠুরতা ও বর্বতা লুকিয়ে ছিল তা তিনি স্বচক্ষে অবলোকন করেন। বিনা কারণে মানুষের প্রতি মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, এর আগে তাঁর জানা ছিলনা। তাইত তরুণ মুহাম্মদকে ভাবিয়ে তুলেছিল। যে করেই হোক এর অবসান করার একটা পথ বের করতেই হবে।

যার ফলশ্রুতিতে তিনি আরবদের কতিপয় যুবকদের নিয়ে গঠিত “হিল্ফুল্ ফুযুল” নামে একটি সেবা সংঘের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করলেন। সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে কর্মসূচী তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন সে গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল- (১) আমরা নিস্ব-অসহায় ও দূর্গতদের সাহায্য করব। (২) আমরা দেশ থেকে অশান্তি দূর করে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করব। (৩) পথিকের জান-মালের হেফাজত করব। (৪) বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনের চেষ্টা করব। (৫) কোনো যালেমকে মক্কায় আশ্রয় দেব না ইত্যাদি।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিচালিত সেবা সংঘের (হিল্ফুল্ ফুযুল)-এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগলেন। কোথায়ও কোন্ অনাথ বালক ক্ষুধার জ্বালায় ক্রন্দন করছে, কোথায় কোন্ দুস্থ পীড়িত রুগ্ন ব্যক্তি আর্তনাদ করছে, কোথায় কোন্ বিধবা নারী নিরাশ্রয় হয়েছে, এগুলোই তিনি সন্ধান করতেন। এতিম শিশুকে তিনি কোলে নিয়ে আদর করতেন।

কোথায়ও বা রোগীর পাসে বসে তার পরিচর্যা করতেন। প্রতিবেশীকে সাহায্য করার জন্য তিনি সদা প্রস্তুত থাকতেন। মানবতার কল্যাণের জন্য নিজের সমস্ত সহায় সম্বল অকাতরে বিলিয়ে দিলেন অথচ তার বিনিময়ে তিনি কিছুই গ্রহণ করলেন না। এমন ত্যাগের তুলনা কোথাও আছে কি? মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের লাভজনক ব্যবসা-বাণিজ্যকে কুরবানী করলেন, তা থেকে উপার্জিত সমস্ত পুঁজি এ মহৎ কাজের জন্য উৎসর্গ করলেন। এমনিভাবে তিনি মানব সেবায় ব্যস্ত থাকতেন।

এই সেবা, ত্যাগ, ও মানবপ্রীতি কি কখনও বৃথা যেতে পারে ? সত্যিকার চেষ্টা ও নিঃস্বার্থ সেবা মানুষ কত দিন অস্বীকার করে চলবে ? তাইত আরবগণ দিন দিন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আকৃষ্ট হতে লাগলেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে একজন সত্যবাদী মানুষ, এ বিশ্বাস সকলের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেল। অবশেষে আরবগণ এক বাক্যে তাঁকে “ আল্-আমীন” উপাধি দান করলেন। নীতি-ধর্ম বিবর্জিত, ঈর্ষা-বিদ্বেষ কলুষিত, পরশ্রী কাতর দুর্ধর্ষ আরবদের নিকট এতটুকুন সম্মান পাওয়া তখন কারও পক্ষে সহজ সাধ্য ছিলনা। অনুপম চরিত্র আর মাধুর্য, সততা আন্তরিকতা, আমানতদারী, কথায় কাজে অপূর্ব সমন্বয় ও অকৃত্রিম মানব প্রেম ছিল বলেই তাঁর পক্ষে এমনটা সম্ভব হয়েছে। তৎকালীন সময় কা’বা ঘরটি নানা কারণে দিন দিন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিল।

তাই ঘরটি সংস্কারের জন্য আরবরা সম্মিলিত ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে। কেউ যাতে বঞ্চিত না হয়, সেজন্যে আরবদের বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা কা’বা-ঘরের বিভিন্ন অংশ ভাগ করে নিল। কিন্তু কা’বা ঘরের দেয়ালে যখন ‘হাজরে আসওয়াদ’ (কালো পাথর) বসানোর সময় এল তখন বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বেঁেধ গেল। অবস্থা এতদূর পর্যন্ত গড়াল যে, অনেকের তলোয়ার পর্যন্ত কোষমুক্ত হল। চারদিন পর্যন্ত এ ঝগড়া চলতে থাকল। পঞ্চম দিনে আবু উমাইয়া বিন মুগীরা প্রস্তাব করেন যে, আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি কা’বা-ঘরে সবার আগে হাজির হবে, এর মীমাংসার দায়িত্ব তাকেই দেয়া হবে। সে যা সিদ্ধান্ত দিবে, তা-ই পালন করা হবে।

সবাই এ প্রস্থাব মেনে নিল। পরদিন সকালে যার আগমন ঘটল তিনি ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ফয়সালা অনুযায়ী তিনি ‘হাজরে আসওয়াদ’ স্থাপন করতে ইচ্ছুক প্রতিটি গোত্রের একজন করে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে বললেন। অতঃপর একটি চাদর বিছিয়ে তিনি নিজ হাতে পাথরটিকে তার ওপর রাখলেন এবং বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিগণকে চাদরের প্রান্ত ধরে পাথরটিকে ওপরে তুলতে বললেন। চাদরটি তার নির্দিষ্ট স্থান বরাবর পৌঁছলে তিনি পাথরটিকে যথা স্থানে নিজ হাতে স্থাপন করলেন।

এতে সবাই খুশী হলেন এবং আসন্ন যুদ্ধের মহা বিপর্যয় থেকে জাতীকে রক্ষা করলেন। এখানে সাম্য-মৈত্রীর যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করলেন, কিয়ামতের আগ পর্যন্ত তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। জীবনের এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়েও সমাজে পরিপূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। অথচ তাঁর জীবনের কোন অংশেই ব্যর্থতা ছিলনা। তাহলে কোথায় ছিল সমস্যা, কিসের অভাব, এ চিন্তায় তাঁকে ব্যাকুল করে তুলল। তিনি গভীরভাবে ভাবতে লাগলেন, তাহলে কোন নীতিমালার ভিত্তিতে সমাজে শান্তি আসতে পারে। আসল কথা হল, সকল মানুষের মধ্যে দু ধরনের গুণাবলীর সমাবেশ থাকে। ভালো ও মন্দ; সুতরাং মানবের আত্মিক উৎকর্ষ সাধন ও সফলতা লাভের জন্যে প্রয়োজন তার ভাল স্বভাবের কাছে মন্দ স্বভাবের পরাজয় বশ্যতা স্বীকার।

অন্যথায় মানুষের দৃষ্টিসীমার আনন্দে সজ্জিত পার্থিব বিলাস সামগ্রী, লোভ লালসার সমূহ আয়োজন, অনর্থক কামতাড়না আর বিস্মৃতির আচ্ছাদনে তার সেই প্রাকৃতিক সুস্থতা বেঁচে থাকতে পারে না। ফলে তার স্বচ্ছ অনুভব আর আবিষ্কার ক্ষমতা বিনষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘ অসুস্থতায় মানুষের রুচি নষ্ট হলে যেমন ভাল খাবারও তিক্ত বলে অনুভূত হয় তেমনি আত্মিক অনুভূতির ধ্বংস হলে, বিবেকের প্রাকৃতিক স্বচ্ছতা ও সুস্থতা হারিয়ে গেলে তার কাছে ভাল-মন্দ পার্থক্যকরণের শক্তি হারিয়ে যায়। তখন মানুষ তার পাশবিকতার কাছে পরাজয়ের মাধ্যমে মানুষের মনুষত্য, নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে পশু স্বভাবে পরিণত হয়। ফলে মানুষ তখন তার ভাল-মন্দ বিচার করতে পারে না। সুতরাং মানুষকে মানুষ হয়ে বাঁচতে হলে প্রয়োজন রিসালাতের। এটা মানুষের ভাল-মন্দ নির্ভুলভাবে বিচার করার একমাত্র মানদন্ড।

মানুষকে ভাল কাজে পরস্পর সহযোগিতা আর মন্দ কাজে বাধা দান, এরই উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে বেঁচে থাকার সমূহ উপকরণ। মানব জীবনের দৈনন্দিন কর্মকান্ডে কল্যাণমূলক কার্যক্ষেত্রে সংঘবদ্ধতা ও পারস্পারিক সহযোগিতার প্রয়োজন পড়ে। পারস্পারিক এই সংঘবদ্ধতা ছাড়া মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে না। সংরক্ষিত থাকে না মানুষের জান-মাল ইজ্জত আবরু। আসলে জীবন ধারণ ও জান মাল ইজ্জত আবরু সংরক্ষণের এই নীতিমালার নাম শরীয়ত। যা রিসালাতের অন্তর্ভূক্ত।

অন্যায় কাজে বাধা দানে সু-সংহত হয় সম্পদের নিরাপত্তা ও জীবনের স্বস্তি। সুতরাং সৎকাজের আদেশ ও অন্যায় কাজে বাধা দানের নীতিমালার সুস্থতা-অসুস্থতার উপর নির্ভর করে পুরো মানব জীবনের শান্তির নিশ্চয়তা। তাই এ নীতিমালা প্রণয়ন হওয়া উচিত এমন এক সত্তার হাতে যিনি সর্ববিষয়ে জ্ঞাত, সকল প্রকার পক্ষপাত থেকে মুক্ত। মানুষের দ্বারা এ ধরনের নীতিমালা তৈরী করা অসম্ভব। সকল মানুষের জন্যে সমভাবে প্রযোজ্য এমন নীতিমালা কেবল ওহীয়ে ইলাহীর আলোকেই রচিত হওয়া সম্ভব। আর এটাই হল রিসালাত। আর রিসালাত যিনি পরিচালনা করবেন তার প্রয়োজন নবুওয়াত। নবুওয়াত ও রিসালাত বিহীন সমাজ ব্যবস্থায় শান্তি কোন দিনও সম্ভব নয়, যা প্রমাণিত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম থেকে নবুয়্যাতের আগ পর্যন্ত জীবনে।

তাঁর মত এমন মানব দরদী, যোগ্য, নিঃস্বার্থ, চরিত্রবান, যার প্রশংসা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা করেছেন। তিনিই যেখানে দীর্ঘ চল্লিশটি বছর আপ্রাণ চেষ্টা করেও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি শুধু নবুওয়্যাত ও রিসালাত না থাকার কারণে। সেখানে আমরা কি করে নবুওয়্যাত ও রিসালাতের সেই আদর্শ বাদ দিয়ে নিজেদের মন গড়া আদর্শ দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা করতে পারি? মূলত: মানব জীবনের সকল সমস্যার সুন্দরতম সমাধানের মাধ্যমে অনন্ত অসীম সফলতার এক জ্যুতিময় পয়গাম হল রিসালাত।

রিসালাতের অমিয় পরশে জীবন ভাস্বরিত হয় অলৌকিক প্রজ্ঞাময়তায়-অদৃশ্য শক্তিতে হয় বলীয়ান। বান্দা ও রবের মধুময় গভীর বাঁধনে জীবন হয় দেদীপ্যমান। বয়ে চলে জীবনস্রোত অনাবিল সুখ, অন্তহীন সার্থকতা ও চিরন্তন সফলতার স্বর্গপানে। বড়ই সার্থক সে জীবন রিসালাতের ছোঁয়ায় যে হয়েছে আন্দোলিত, স্পন্দিত ও অনুগত। আমরা তার বাস্তবতা উপলদ্ধি করব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়্যাতের পরবর্তী জীবনী থেকে। পরবর্তীতে নবুয়্যাতের সূচনা থেকে হিজরতের আগ পর্যন্ত ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়্যাতের মক্কী জীবন’ শিরনামে তাঁর জীবনের দ্বিতীয় পর্যায় আলোকপাত করব, ইন্শা আল্লাহ।

তাওবা-ইস্তেগফারের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়

তাওবার বিষয়টি আলোচনা করার আগে গুনাহ ও শিরক সর্ম্পকে আলোচনা করা দরকার। গুনাহ ও শিরকের বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর তাওবার বিষয়টি আলোচনা করা হলে তাওবা করতে সহজ হবে। তাই প্রথমে গুনাহ, দ্বিতীয়ত শিরক ও তৃতীয়ত তাওবার বিষয়টি আলোচনা করা হলো।
গুনাহ
আল্লাহর ও আল্লাহর রাসূল যেসব কাজ করতে বলেছেন তা না করা এবং যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন তা করা হলো গুনাহ। খারাপ কথা, খারাপ কাজ ও খরাপ আচরণও গুনাহ। কারো হক নষ্ট করা, কাউকে গালি দেয়া, কাউকেও কষ্ট দেয়া, কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করা, আল্লাহর দেয়া সিমা লংঘন করাও গুনাহের কাজ। গুনাহ আল্লাহর সাথে ও বান্দার সাথে জড়িত। আল্লাহর সাথে জড়িত গুনাহ আল্লাহ ইচ্ছা করলে মাপ করে দিতে পারেন কিন্তুু বান্দার সাথে গুনাহ বান্দা যতক্ষন পর্যন্ত মাপ না করে দিবেন ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহও মাপ করতে পারবেন না।
গুনাহের প্রকার
গুনাহ সাধারণত তিন প্রকারের হয়ে থাকে।
১. ফরয ইবাদত ছেড়ে দেড়া : আল্লাহতায়ালা বান্দার উপর যে সকল ইবাদত ফরয করেছেন সে গুলোকে ছেড়ে দেয়া। যেমন নামায, রোজা, যাকাত ইত্যাদি। সালাত আদায় না করা কবীরা গুনাহ অনুরূপভাবে সওম এবং যাকাত আদায় না করাও কবীরা গুনাহ। এ ধরনের গুনাহ হতে মাপ পাওয়ার জন্য করণীয় হল, যে সকল ইবাদত ছুটে গিয়াছে তা যথা সম্ভব ক্বাযা আদায় করা। আর যদি ক্বাযা আদায় করা সম্ভব না হয় তার বিকল্প যেমন রোজার ক্ষেত্রে ফিদয়া আদায় করা। আর যদি তাও সম্ভব না হয় তবে তার জন্য আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতে হবে এবং আল্লাহর নিকট হতে মাপ করিয়ে নিতে হবে।
২. নিষিদ্ধ কাজ করা : আল্লাহ এবং বান্দার মাঝে সংঘটিত গুনাহসমুহ। যেমন : মদ পান করা, গান বাজনা করা, সুদ খাওয়া ইত্যাদি। এ ধরনের গুনাহের কারণে অবশ্যই লজ্জিত হতে হবে এবং মনে মনে প্রত্যয়ী হতে হবে যে এ ধরনের গুনাহ ও অপরাধ আর কখনো করবে না।
৩. গুনাহ বান্দার সাথে সর্ম্পকিত : গুনাহের সর্ম্পক বান্দার সাথে। এ ধরনের গুনাহ সবচেয়ে কঠিন ও মারাত্মক। এ ধরনের গুনাহ আবার কয়েক ধরনের হতে পারে-
(ক) মালের সাথে সর্ম্পকিত : ধন সম্পদের সাথে সম্পর্কিত, এ বিষয়ে করণীয় হল যে লোকের কাছ থেকে কর্জ নিয়েছেন অথবা যার হক্ব নষ্ট করেছেন কিংবা যার ক্ষতি করেছেন, আপনাকে অবশ্যই তার পাওনা পরিশোধ করতে হবে এবং তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যদি পরিশোধ বা ফেরত দেয়া সম্ভব না হয়, হয়ত যে সম্পদটি আপনি নষ্ট করেছিলেন তা এখন আর আপনার নিকট অবশিষ্ট নাই, কিংবা আপনি নি:স্ব হয়ে গিয়েছেন তাহলে অবশ্যই আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত লোকটি হতে ক্ষমা চাইতে হবে এবং তার থেকে অনুমতি নিয়ে তা হালাল করে নিতে হবে। আর যদি এ রকম হয় যে লোকটি মারা গিয়েছে অথবা অনুপুস্থিত। যার কারণে ক্ষতিপূরণ দেয়া কিংবা মাফ নেওয়া এর কোনটিই সম্ভব নয় তাহলে তার পক্ষ হতে তা দান করে দিতে হবে। আর যদি তাও সম্ভব না হয়, তবে তাকে অবশ্যই বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে, আল্লাহর দরবারে বেশী বেশী তাওবা ও কান্নাকাটি করতে হবে যাতে আল্লাহ ক্বিয়ামত দিবসে লোকটিকে আপনার উপর রাজি করিয়ে দেয়।
(খ) মানুষের সাথে সর্ম্পকিত : মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত, যেমনÑহত্যা করা বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট করা, তাহলে আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অথবা তার অবিভাবককে ক্বিসাস বা প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ দিতে হবে অথবা তারা আপনাকে ক্ষমা করে দিবে এবং কোনো বদলা নেবে না মর্মে একটি সমঝতায় পৌঁছতে হবে। আর যদি তাও সম্ভব না হয়, তবে অবশ্যই আল্লাহর দরবারে বেশী বেশী তাওবা ও কান্নাকাটি করতে হবে, যাতে আল্লাহ ক্বিয়ামত দিবসে লোকটিকে আপনার উপর রাজি করিয়ে দেন।
(গ) মানুষের সমভ্রম হরণ করা : গীবত করা, কারো বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া অথবা গালি দেয়া ইত্যাদি। তখন আপনার করণীয় হল, যার বিপক্ষে এ সকল কথা বলেছিলেন, তার নিকট গিয়ে নিজেকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করা এবং বলা যে ভাই আমি মিথ্যুক, আমি আপনার বিরুদ্ধে যে সব অপবাদ বা বদনাম করেছি তা ঠিক নয় আমি মিথ্যা বলেছি। আর যদি ঝগড়া বিবাদ বা নতুন কোন ফাসাদ কিংবা লোকটির ক্রোধ আরো প্রকট আকার ধারণ করার সম্ভাবনা না থাকে তবে তার নিকট সব কিছু প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। অন্যথায় আল্লাহর নিকট অধিক হারে তাওবা করতে হবে। যাতে আল্লাহ তাকে আপনার উপর রাজি করিয়ে দেন। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা আল্লাহ যেন লোকটির জন্য এর বিপরীতে তার জন্য অশেষ কল্যাণ নিহিত রাখে এবং তার জন্য বেশী বেশী প্রার্থনা করবেন।
(ঘ) ইজ্জত হরণ করা : যেমন কারো অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের ইজ্জত হরণ অথবা সন্তান-সন্তুতির অধিকার নষ্ট বা খিয়ানত করা।
গুনাহের খারাপ পরিণতি ও ক্ষতিকর দিকসমূহ
গুনাহ মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতের জন্যই ক্ষতিকর। গুনাহের কারণে মানুষ দুনিয়াতে লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, অপমান-অপদস্থের শিকার হয়। দুনিয়ার জীবনে তার অশান্তির অন্ত থাকে না। অনেক সময় দুনিয়ার জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। ফলে দুনিয়াতেও গুনাহের কারণে তাকে নানাবিধ শাস্তি ও আজাব-গজবের মুখোমুখি হতে হয় এবং আখেরাতে তো তার জন্য রয়েছে অবর্ণনীয়-সীমাহীন দুর্ভোগ। এ ছাড়া গুনাহ কেবল মানুষের আত্মার জন্যই ক্ষতিকর নয় বরং আত্মা ও দেহ দুটির জন্যই ক্ষতিকর। গুনাহ মানুষের জন্য কঠিন এক ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনে। গুনাহ মানুষের আত্মার জন্য এমন ক্ষতিকর যেমনিভাবে বিষ দেহের জন্য ক্ষতিকর।
১. ইলম তথা দ্বীনি জ্ঞান লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়া : ইলম হল নূর যা আল্লাহ মানুষের অন্তরে স্থাপন করেন কিন্তু গুনাহ-পাপাচার এ নূরকে নিভিয়ে দেয়। সুতরাং গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি কখনো ইলম তথা শরিয়তের জ্ঞান লাভে ধন্য হতে পারে না। ইলম হল, আল্লাহর নূর আর গুনাহ হলো অন্ধকার। আর এ কথা স্পষ্ট যে, আলো ও অন্ধাকার কখনো এক হতে পারে না।
২. রিযিক থেকে বঞ্চিত হওয়া : বান্দা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে রিযিক হতে বঞ্চিত হয়। মানুষের রিযিকে সংকীর্ণতা দেখা দেয়। সুতরাং, রিযিকের স্বচ্ছলতা কামনাকারীদের জন্য গুনাহের কাজ ছেড়ে দিতে হবে।
৩. গুনাহ দেহ ও আত্মাকে দুর্বল করে দেয় : নেক আমলের কারণে মানুষের চেহারা উজ্জ্বল হয়, অন্তর আলোকিত হয়, রিযিক বৃদ্ধি পায়, দেহের শক্তি ও মনোবল চাঙ্গা হয়, মানুষের অন্তরে মহব্বত বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে খারাপ কাজে মানুষের চেহারা কুৎসিত হয়, অন্তর অন্ধকার হয়, দেহ দুর্বল হয়, রিযিক সংকীর্ণ হয় এবং মানুষের অন্তরে তার প্রতি ঘৃণা জন্মায়।
৪. গুনাহ আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য হতে বঞ্চিত করে : গুনাহ আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য হতে বঞ্চিত করে। যদি গুনাহের কারণে তাকে কোন শাস্তি নাও দেয়া হয়, কিন্তু সে আল্লাহর বিশেষ ইবাদত বন্দেগী হতে বঞ্চিত হবে।
৫. গুনাহকে ঘৃণা বা খারাপ জানার অনুভূতি হারিয়ে ফেলে : ফলে গুনাহের কাজে সে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং সমস্ত মানুষও যদি তাকে দেখে ফেলে বা তার সামলোচনা করে এতে সে লজ্জাবোধ বা গুনাহ করাকে খারাব ও অন্যায় মনে করে না। এ ধরনের মানুষকে আল্লাহ ক্ষমা করেন না এবং তাদের তাওবার দরজাও বন্ধ হয়ে যায়।
৬. গুনাহর গোষণা না দেয়া : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন ‘‘আমার সকল উম্মতকে ক্ষমা করা হবে একমাত্র ঘোষণা দানাকারী ছাড়া। আর ঘোষণা হল, কোন ব্যক্তি রাতে কোন পাপ করল আর আল্লাহ তার অপকর্মকে গোপন রাখলেন কিন্তু লোকটি সকালে লোকদের ডেকে ঘোষণা করতে লাগল, হে অমুক আমি রাতে এই এই কাজ করেছি। রাতে তার রব তাকে গোপন করল আর সকালে সে আল্লাহর গোপন করা বিষয় প্রকাশ করে দিল। (সহীহ মুসলিম)
৭. গুনাহকে কিছু মনে না করা : বান্দা গুনাহ করতে করতে গুনাহ তার জন্য সহজ হয়ে যায়, অন্তরে সে গুনাহকে ছোট মনে করতে থাকে। তার মধ্যে অপরাধ বোধ অবশিষ্ট থাকে না। ফলে সে কোন অপরাধকে অপরাধ মনে করে না। আর এটাই হল একজন মানুষের জন্য ধ্বংসের নিদর্শন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-“মু’মিন নিজ গুনাহগুলোকে এমনভাবে দেখে যে, যেন একটি পাহাড়ের পাদদেশে বসে আছে আশঙ্কা করছে যে সেটি তার উপর পতিত হবে আর পাপী নিজ গুনাহসমূহকে মাছির মত মনে করে যা তার নাকের উপর পড়েছে একটু পর উড়ে গিয়েছে। (সহীহ মুসলিম)
৮. গুনাহ লাঞ্ছনা ও অপমানের কারণ হয়ে থাকে : সকল প্রকার ইজ্জত একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আল্লাহর আনুগত্যের বাহিরে কোথাও ইজ্জত সম্মান পাওয়া যাবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা ইজ্জত দান করেন আর যাকে ইচ্ছা বেÑইজ্জত করেন। আল্লাহ বলেন-‘‘কেউ ইজ্জতের আশা করলে মনে রাখতে হবে যে, সমস্ত ইজ্জত আল্লাহরই।’’ (ফাতের : ১০) অর্থাৎ ইজ্জত আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমেই তালাশ করা উচিত, কারণ, আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া কোথাও ইজ্জত খুঁজে পাওয়া যাবে না। আল্লাহর আনুগত্যের বাহিরে যে ইজ্জত তালাশ করবে তাকে অবশ্যই বে ইজ্জত হতে হবে। তাকে ভোগ করতে হবে লাঞ্ছনা, বঞ্চনা আর হতাশার গানী। তাই আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমেই ইজ্জত তালাশ করতে হবে।
৯. গুনাহ মানুষের জ্ঞান বুদ্ধিকে ধ্বংস করে দেয় : কারণ মানুষের জ্ঞান বুদ্ধির জন্য একটি আলো বা নূর থাকে আর গুনাহ ঐ নূর বা আলোকে নিভিয়ে দেয়, ফলে জ্ঞান বুদ্ধি ধ্বংস হয়ে যায়।
১০. গুনাহ অন্তরকে কাবু করে ফেলে : গুনাহ গুনাহকারীর অন্তরকে কাবু করে ফেলে এবং সে ধীরে ধীরে অলসদের অর্ন্তভুক্ত হয়। যেমন আল্লাহ বলেন-অর্থাৎ ‘‘কখনো না, বরং তারা যা করে তাই তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।’’ (মুতাফফিফীন : ১৪)
এ আয়াত সম্পর্কে ওলামায়ে কেরাম বলেন, বার বার গুনাহ করার কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে। তখন তার অন্তর আর ভাল কিছু গ্রহণ করে না। ভাল কাজ, ভাল কোন উপদেশ এবং মনীষীদের বাণী সবই তার কাছে অসহনীয় ও বিরক্তিকর মনে হয়। ফলে সে তার মনের ইচ্ছা ও খেয়াল খুশি মত যা ইচ্ছা তাই করতে থাকে। কোন অন্যায় অপরাধ তার নিকট অন্যায় মনে হয় না। গুনাহ তার নিকট আর গুনাহ বলে বিবেচিত হয় না। এ ধরনের লোকের সংখ্যা বর্তমান সমাজে অসংখ্য রয়েছে। তারা সালাত আদায় করে না, সওম পালন করে না, যাকাত প্রদান করে না। কিন্তু এ সব যে প্রতিটিই মারাত্মক অপরাধ তা তাদের মনে একটুও রেখাপাত করে না। তারা যে অপরাধী, গুনাহগার ও পাপী এ ধরনের কোন অনুভূতি তাদের মনষ্পটে জাগ্রত হয় না এবং তাদের বিবেক বিন্দু পরিমাণও নাড়া দেয় না। ফলে তাদের অন্তর পাথরের চেয়ে বেশি কঠিন হয়ে যায়। তাদের অন্তরসমূহ হককে গ্রহণ করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। ফলে এক পর্যায়ে ঈমান হারা হয়ে মারা যায়। আল্লাহ আমাদেরকে এ ধরনের পরিণতি হতে হেফাজত করুন।
১১. গুনাহ বান্দাকে অভিশাপের অর্ন্তভুক্ত করে : গুনাহ বান্দাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অভিশাপের অর্ন্তভুক্ত করে। কারণ, তিনি গুনাহগারদের ওপর অভিশাপ দিয়েছেন। যেমন সুদ গ্রহীতা, দাতা, লেখক ও সাক্ষী-সকলের উপর অভিশাপ করেছেন। এমনিভাবে অভিশাপ করেছেন চোরের উপর। গাইরুল্লাহর নামে জবেহকারী, জীবের ছবি অংকনকারী, মদ্যপানকারীসহ বিভিন্ন গুনাহের উপর তিনি অভিশাপ করেছেন। সুতরাং, মনে রাখতে হবে, যে গুনাহের কারণে আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিশাপ করেছেন সে সব গুনাহে লিপ্ত হলে তাকে অবশ্যই আল্লাহ ও তার রাসূলের অভিশাপের ভাগীদার হতে হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের অভিশাপের ভাগীদার হয় তার পরিণতি যে কী হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
১২. গুনাহ দু’আ হতে বঞ্চিত করে : গুনাহ আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার ফেরেশতাদের দু’আ হতে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়। কেননা, আল্লাহ তার নবীকে বান্দা বান্দীদের জন্য দু’আ করার আদেশ দিয়েছেন।
ইবাদত, আনুগত্য ও খেলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য মহান আল্লাহ আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। বাঁচিয়ে রেখেছেন নানা নেয়ামতরাজী দ্বারা। সুতরাং আনুগত্য করাই আমাদের কাজ। কল্যাণ ও কামিয়াবির পথ এটিই। তার পরও নফস-শয়তানের প্রবঞ্চনায় অন্যায়-অপরাধ হতে পারে, হয়ে যায়। কিন্তু রহমানুর রাহীম মহান আল্লাহর করুণা সীমাহীন। তিনি বান্দাকে অপরাধ মুক্ত হিসাবে হাশরে উপস্থিত দেখতে চান। তাই অন্যায় হয়ে গেলেও তার প্রতিকারের সুন্দর ব্যবস্থা রেখেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, পাপ থেকে তাওবাকারী এমন হয়ে যায় যেন সে পাপই করেনি। তিনি আরো বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ মৃত্যুর লক্ষণ শুরু হওয়া অবধি বান্দার তাওবা কবুল করেন। তাই সুবিবেচনা ও নিজের প্রতি ইনসাফের পরিচয় হবে, সর্বদা পাপমুক্ত থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করা। যদি পাপ হয়ে যায় তাহলে অবশ্যই তাওবা সুযোগ গ্রহণ করা। তাওবাতে আল্লাহ অনেক খুশি হন।

পরকালে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ

আল্লাহ তাআলা পরকালে তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহারস্বরূপ তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এ সাক্ষাতে চলে অনন্তকাল। তা হবে বান্দার সঙ্গে আল্লাহ তাআলার প্রেমের সাক্ষাৎ।

এছাড়া প্রতিটি মানুষ কিয়ামতের দিন তার প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। চাই সে ভালো আমল করুক বা খারাপ আমল করুক। হোক সে মুমিন নতুবা কাফের।

আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন মুমিন বান্দার সঙ্গে যে সাক্ষাৎ দেবেন, সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যেদিন আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে; সেদিন তাদের অভিবাদন হবে সালাম। তিনি তাদের জন্য সম্মানজনক পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।’ (সুরা আহজাব : আয়াহ ৪৪)

আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার ঈমানদারদের সুসংবাদ প্রদানে ইরশাদ করেন, ‘আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। আর নিশ্চিতভাবে জেনে রাখ, আল্লাহর সঙ্গে তোমাদের সাক্ষাৎ করতেই হবে। আর যারা ঈমানদার তাদের সুসংবাদ জানিয়ে দাও।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ২২৩)

আল্লাহ তাআলা দিদার লাভ করা সহজ ব্যাপার নয়; তাও তিনি কুরআনে মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মানুষ! তোমাকে তোমার পালনকর্তা পর্যন্ত পৌঁছতে কষ্ট স্বীকার করতে হবে, অতপর তার সাক্ষাৎ ঘটবে।’ (সুরা ইনশিকাক : আয়াত ৬)

পরিশেষে…
যারা আল্লাহ সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করার প্রত্যাশী তাদের মাওলার পাঠানো কুরআন অনুযায়ী জীবন-যাপন করা আবশ্যক। যারা আল্লাহ বিধি-বিধান পালন করে তাঁর নৈকট্য অর্জন করতে সক্ষম হবে, তারাই সফলকাম হবে। তাদের জন্যই রয়েছে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের মহা সুযোগ।

হাদিসে এসেছে-
হজরত ওবাদা ইবনে সামেত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করা পছন্দ করে; আল্লাহও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা পছন্দ করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা অপছন্দ করেন; আল্লাহও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাকে অপছন্দ করেন। (বুখারি ও মুসলিম)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহ তাআলার দিদার লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

রাসূলে কারিম (সা.)-এর দোয়া

দোয়া হচ্ছে ইবাদতের মূল ও ইবাদতের প্রাণ। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করাই ইবাদতের মূল চেতনা। নবী পাক সা: এরশাদ করেছেন ‘দোয়াই হচ্ছে ইবাদত।’ কারণ দোয়ার মাধ্যমে বান্দাহ (আব্দ) নিজের প্রতিপালকের কাছে স্বীয় অভাব ও কষ্টের কথা পেশ করে এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করে আল্লাহর মহত্ত্ব ও প্রভুত্বের স্বীকৃতি দান করে, নিজের দাসত্বের অঙ্গীকার করে এবং নিজের অক্ষমতা ও দুর্বলতা প্রকাশের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে। বন্দেগির এরূপ প্রকাশ নিছক একটি ইবাদত নয়, বরং ‘ইবাদতের নির্যাস।’ নু’মান ইবনে বাশির রা:-এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, দোয়াই ইবাদত। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন :﴿وَقَالَرَبُّكُمُادْعُونِيأَسْتَجِبْلَكُمْۚ তোমরা আমাকে ডাক। আমি তোমাদের (ডাকে) সাড়া দেবো। (সূরা মুমিন : ৬০)। নবী করিম সা: তাই আল্লাহর কাছে তাঁর যাবতীয় চাওয়া-পাওয়া, অভাব-অভিযোগসহ জাগতিক ও পরকালীন সব বিষয়ে বিনয়সহকারে কাতর হৃদয়ে প্রার্থনা করতেন। কুরআনে বর্ণিত দোয়া ও মুনাজাত পাঠের পাশাপাশি নিজ থেকেও তিনি অনেক দোয়া ও ফরিয়াদ আল্লাহর কাছে পেশ করতেন। কিছু দোয়া তিনি সর্বদা করতেন আর কিছু দোয়া তিনি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে স্থান-কাল অনুসারে করতেন। তবে প্রায় সব দোয়ার মধ্যেই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের কথা ঘোষণা করেই তাঁর আবেদনের বিষয়বস্তু তুলে ধরতেন। এসব দোয়া কখনো নামাজে কখনো নামাজের বাইরে, আবার কখনো দুই হাত তুলে, আবার কখনো বা হাত না তুলে তিনি তা নিবেদন করতেন। ইবনে আব্বাস রা: বর্ণনা করেছেন, রাসূল সা: যখন রাতের বেলায় তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়াতেন, তখন বলতেন ‘হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই জন্য। তুমিই আসমান-জমিন ও এ দুইয়ের মধ্যস্থিত সব কিছুর ব্যবস্থাপক, তোমার জন্যই সকল প্রশংসা, তুমি আসমান-জমিন ও এ দুইয়ের মধ্যস্থিত সব কিছুর নূর বা আলো। সব প্রশংসা তোমারই। একমাত্র তুমিই আসমান-জমিন ও এ দুয়ের মধ্যস্থিত সকল জিনিসের মালিক, সব প্রশংসা একমাত্র তোমারই, তুমিই বাস্তব ও সত্য, তোমার প্রতিশ্রুতি সত্য, তোমার সাথে সাক্ষাৎ সত্য, তোমার বাণী সত্য, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, সকল নবীই সত্য, মুহাম্মদ সা: সত্য ও কিয়ামত সত্য। হে আল্লাহ আমি তোমার কাছেই আত্মসমর্পণ করেছি, তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি, তোমার ওপরই তাওয়াক্কুল করেছি, তোমাকে স্মরণে রেখেই আমার সব কাজের ব্যবস্থাপনা করেছি, তোমার কারণে বিবাদে লিপ্ত হয়েছি এবং তোমার কাছেই সব বিষয়ে মীমাংসার জন্য পেশ করেছি। অতএব আমার অতীত ও ভবিষ্যতের প্রকাশ্য ও গোপন সব অপরাধ ক্ষমা করে দাও। তুমিই অগ্রবর্তী ও পরবর্তী। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ বা রব নেই।’
বিপদে-আপদে ফজরের নামাজের শেষ রাকাতে রুকু থেকে দাঁড়িয়ে তিনি কুনুতে নাজিলা পড়তেন। আর তা হচ্ছে : ‘হে আল্লাহ যাদের তুমি পথ দেখিয়েছ তাদের দলে শামিল করে আমাকেও পথ দেখাও, যাদের তুমি ক্ষমা করেছ তাদের দলে শামিল করে আমাকেও ক্ষমা করো, যাদের তুমি অভিভাবকত্ব করেছ, আমাকেও তুমি তাদের দলে শামিল করে নাও। আমাকে যা দিয়েছ তাতে বরকত দান করো। দূরদৃষ্টি থেকে তুমি আমাকে রক্ষা করো। নিশ্চয় তুমি নিয়ন্ত্রতা কখনো নিয়ন্ত্রিত নও। যে তোমার বন্ধু হবে সে লাঞ্ছিত হবে না। হে প্রভু! তুমিই বরকতের মালিক ও সর্বোচ্চ মর্যাদাবান।’ ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেন বিপদে-আপদে কুনুত পড়া এবং তা দূর হলে ছেড়ে দেয়া হজরতের রীতি ছিল। তিনি ফজর নামাজের জন্য এটা নির্দিষ্ট করেননি, তবে সেই নামাজেই বেশি পড়তেন। ইমাম আহমদ ইবনে আব্বাস রা: থেকে হাদিস বর্ণনা করে বলেন, হজরত সা: জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজের সময় দোয়া কুনুত পড়তেন, যখন তিনি শেষ রাকাতে সামিআল্লাহ হুলিমান হামিদাহ বলে দাঁড়াতেন তখন তিনি বনু সালিম, রা-আল, জাকোয়ান ও ইসিয়া গোত্রের জন্য বদদোয়া করতেন, পেছনের মুক্তাদিরা আমিন বলতেন। এভাবে রাসূলে করিম সা: আল্লাহর কাছে অবারিতভাবে দোয়া করতেন, আর আল্লাহর মহান দরবারে সে দোয়া কবুল হয়ে যেত। হাদিস শরিফে রাসূলে পাক সা:-এর এরূপ অসংখ্য দোয়া ও মুনাজাত দেখতে পাওয়া যায়। নবী পাক সা:-এর কয়েকটি দোয়া :
হে আল্লাহ! কবরের আজাব দজ্জালের ফিতনা জীবন-মরণের সর্ববিধ ঝঞ্ঝাট এবং পাপ ও ঋণের হাত থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই।
হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করো। আমার ঘরের দৈন্যদশা দূর করে দাও, আর আমার রিজিকে বরকত দান করো।
হে আল্লাহ! আমার কাজকর্মে দৃঢ়তা ও অগ্রগামিতা দান করো, তোমার উত্তম ইবাদতের ক্ষমতা দাও। সুস্থ আত্মা ও সত্য ভাষণের অধিকারী করো, তোমার যা কিছু ভালো বলে জানা রয়েছে তা দাও, আর যা কিছু তুমি ক্ষতিকর বলে জানো তা থেকে রক্ষা করো। আমার যত পাপ যা তোমার জানা রয়েছে তা থেকে তোমার কাছে আমি ক্ষমা চাই।
হে প্রভু! তুমি আমাকে নামাজে পরহেজগারি দান করো, তাতে পবিত্র রাখো। তুমি উত্তম পবিত্রকারী, তুমি আমার নামাজের অভিভাবক ও প্রভু।
হে প্রভু! আমাকে ক্ষমা করো, দয়া করো এবং পথ দেখাও।
হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় চাই অলসতা, অতি বার্ধক্য, সর্বপ্রকারের গুনাহ, ঋণগ্রস্থতা, কবরের আজাব, জাহান্নামের আজাব ও প্রাচুর্যের মন্দ পরিমাণ থেকে। তোমার কাছে আরো আশ্রয় চাই দারিদ্র্যের ফিতনা থেকে ও মসীহ দজ্জালের ফিতনা থেকে। হে আল্লাহ তুমি আমার পাপসমূহ তুষার ও শিলা বৃষ্টি দ্বারা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দাও। আমার হৃদয় মনকে এমনভাবে পরিষ্কার করে দাও, যেমন সাদা বস্ত্রকে ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। আমি ও আমার পাপসমূহের মাঝে এতটা দূরত্ব সৃষ্টি করে দাও যতটা দূরত্ব তুমি সৃষ্টি করেছ পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের মধ্যে।
হে আল্লাহ! আমি তোমার জ্ঞানের সাহায্যে তোমার কাছে কল্যাণ কামনা করছি, আমি তোমার শক্তির সাহায্যে তোমার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি, কেননা তুমি ক্ষমতাবান ও আমি অক্ষম, তুমি জ্ঞানবান আর আমি জ্ঞানহীন, আর অদৃশ্য বিষয়ে তুমি পূর্ণরূপে পরিজ্ঞাত। হে আল্লাহ! তোমার জ্ঞানে, আমার এ কাজ (সংশ্লিষ্ট কাজের বর্ণনা) আমার দ্বীন, জীবন ও জীবিকা, কর্মের পরিণাম বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যে যদি কল্যাণকর হয়, তাহলে তুমি তা আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও। আর যদি তোমার জ্ঞানে এ কাজ আমার জন্য মঙ্গল না হয়, তাহলে তা আমার থেকে ফিরিয়ে নাও এবং আমাকেও তা থেকে ফিরিয়ে রাখো। আমার জন্য সর্বক্ষেত্রে কল্যাণ নির্ধারণ করো।
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে চারটি বিষয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করি। এমন জ্ঞান থেকে যা কোনো উপকারে আসে না, এমন অন্তর থেকে যা ভয় করে না, এমন আত্মা থেকে যা পরিতৃপ্ত হয় না এবং এমন দোয়া থেকে যা কবুল হয় না।
হে আল্লাহ! আমার আত্মাকে তুমি অপবিত্রতা থেকে পবিত্র রাখো, আমার আমলকে তুমি প্রদর্শনী থেকে মুক্ত রাখো, আমার চুকে তুমি খিয়ানত থেকে মুক্ত রাখো। কেননা চুর খিয়ানত সম্পর্কে এবং অন্তরের গোপনীয়তা সম্পর্কে তুমি সম্যক অবগত।
আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও তাঁর কোনো শরিক নেই। সব সাম্রাজ্য তাঁর এবং সকল প্রশংসাও তাঁর। তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
হে আল্লাহ! দুনিয়া ও আখিরাতে তোমার কাছে ক্ষমা ও সুস্থতা প্রার্থনা করি।
হে প্রভু! তোমার কাছে দোয়া কামনায় আমাকে ব্যর্থকাম করো না এবং আমার অনুকূলে তুমি বড়ই মেহেরবান ও দয়ালু হিসেবে ধরা দাও। হে সর্বোত্তম প্রার্থনা পূরণকারী ও সর্বদাতা প্রভু!
হে আল্লাহ! তুমি আমার অন্তরে নূর (আলো) দাও, আমার কবরে নূর দাও, আমার সামনে ও আমার পেছনে নূর দাও। আমার ডান ও আমার বামে নূর দাও। আমার ওপরে এবং আমার নিচে নূর দাও। আমার কানে, আমার চোখে, আমার পশমে, আমার চামড়ায়, আমার মাংসে, আমার রক্তে, আমার হাড়ে নূর দাও। হে আল্লাহ! আমার নূরকে বর্ধিত করে দাও এবং আমার জন্য নূরের স্থায়ী ব্যবস্থা করো। তুমি পবিত্র (আল্লাহ), যিনি ইজ্জত ও মহত্ত্বের চাদরে আবৃত এবং নিজের জন্য তাকে বিশিষ্ট করে নিয়েছ। তিনি পবিত্র যিনি সম্মানের জামা পরিহিত এবং মর্যাদা দ্বারা সম্মানিত। তিনিই সুমহান যিনি ছাড়া আর কারো জন্য তাসবিহ পড়া বাঞ্ছনীয় নয়। তিনিই পবিত্র যিনি সমস্ত দানের ও নিয়ামতের অধিকারী, যিনি সুমহান ও মর্যাদাবান। পবিত্র তিনি যিনি মহিমাময় ও মহানুভব।
সাইয়্যেদুল ইসতিগফার হিসেবে যে দোয়াটি নবী পাক সা: আমাদের শিখিয়েছেন তা হচ্ছে : হে আল্লাহ! তুমি আমার রব, তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ, আমি তোমার গোলাম। আমি যথাসাধ্য তোমার সাথে কৃত ওয়াদা ও অঙ্গীকারের ওপর অটল আছি। আমার কর্মের মন্দ পরিণাম থেকে তোমার আশ্রয় চাই। তুমি আমাকে যত নিয়ামত দান করেছ, আমি সবই স্বীকার করেছি এবং স্বীকার করছি আমার গোনাহের কথাও। হে প্রভু! তুমি আমাকে ক্ষমা করো। তুমি ছাড়া আর কেউ ক্ষমা করতে পারে না। (বোখারি)

‘আল্লাহ’ লেখা গোশতের টুকরা কি খাওয়া যাবে?

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

আসসালামু আলাইকুম, সম্মানিত মুফতি সাহেব, আপনার কাছে আমার জানার বিষয় হলো, কয়েকদিন আগে আমরা একটি গরু জবাই করি, গরুর গোস্ত কাটার সময় হঠাৎ করে একটি গোস্তের টুকরার মাঝে পরিস্কারভাবে “আল্লাহ” লেখা দেখতে পাই। উক্ত টুকরাটি আমরা আলাদা করে রেখে দেই। আমার প্রশ্ন হলো, উক্ত গোস্তের টুকরাটি আমরা কী করব? খেতে পারব কি?

এমন আরো অনেকের মুখেই শুনেছি, আলুসহ অন্যান্য খাবার বস্তুর মাঝেও এমন আল্লাহ লেখা পাওয়া যায়। এখন বস্তুগুলো খাওয়া যাবে কি? নাকি কোনো পবিত্র স্থানে সংরক্ষিত করে রাখতে হবে? দয়া করে জানালে কৃতজ্ঞ হবো। এ খবর দিয়েছে দৈনিক কালের কন্ঠ।

উত্তর :

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم

উক্ত গোস্ত বা আলু ইত্যাদি খাওয়াতে কোনো সমস্যা নেই। বরং বরকতের নিয়তে খুশি মনেই খাওয়া উচিত। [ফাতাওয়া কাসিমীয়া : ২৪/৭৬]

أَبُو عَبْدِ الله السُّلَمِيُّ: ” فِي ذِكْرِ مَنْصُورِ بْنِ عَمَّارٍ وَأَنَّهُ أُوتِيَ الْحِكْمَةَ، وَقِيلَ: إِنَّ سَبَبَ ذَلِكَ أَنَّهُ وَجَدَ رُقْعَةً فِي الطَّرِيقِ مَكْتُوبًا عَلَيْهَا بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ فَأَخَذَهَا فَلَمْ يَجِدْ لَهَا مَوْضِعًا فَأَكَلَهَا فَأُرِيَ فِيمَا يَرَى النَّائِمُ قَائِلًا يَقُولُ لَهُ: قَدْ فَتَحَ اللهُ عَلَيْكَ بَابُ الْحِكْمَةِ بِاحْتِرَامِكَ لِتِلْكَ الرُّقْعَةِ، وَكَانَ بَعْدَ ذَلِكَ يَتَكَلَّمُ بِالْحِكْمَةِ (شعب الإيمان للبيهقى، فصل فى تعظيم المصحف، دار الكتب العلمية بيروت-2/545/ رقم-2662، مكتبة الرشد للنشر، رقم- 2416)

উত্তর দিয়েছেন : লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

কেন বিলম্বিত হয়েছিল রাসূল (সা.)-এর দাফন

কারেন্টনিউজ ডটকম ডটবিডি

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘ভূপৃষ্ঠের সব কিছুই ধ্বংসশীল, একমাত্র আপনার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তার সত্তা ছাড়া। (সুরা আর রাহমান : ২৬-২৭) আরো ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।’ (আলে ইমরান : ১৮৫) অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে। যখন তাদের মেয়াদ এসে যাবে, তখন তারা না এক মুহূর্ত পিছে যেতে পারবে, আর না এগিয়ে আসতে পারবে।’ (সুরা আল আরাফ : ২৪, সুরা ইউনুস : ৪৯) কাজেই নবী-রাসুলদেরও মৃত্যুবরণ করা বিধিবদ্ধ।

নবী-রাসুলদের ওফাত : নবী-রাসুলরা যেহেতু মানুষ ছিলেন, সেহেতু তাঁদের মৃত্যু হওয়া স্বাভাবিক। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর মুহাম্মদ একজন রাসুল মাত্র। তাঁর আগেও বহু রাসুল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন বা শহীদ হন, তবে কি তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুত কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাআলা তাদের সওয়াব দান করবেন।’ (আলে ইমরান : ১৪৪)

তবে নবী-রাসুলদের এই স্বাধীনতা দেওয়া হয় যে আপনি কি পৃথিবীতে থাকতে চান? না কি চলে যেতে চান। কিন্তু নবী-রাসুলরা চলে যাওয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছেন (বুখারি, হাদিস : ৬৫০৯)

ওফাতকালীন অবস্থা : রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ অবস্থায় একদা আপন গোত্রের লোকদের উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘হে নবীর কন্যা ফাতেমা এবং হে নবীর ফুফু সাফিয়া! নেক কাজ করো, নেক কাজ করো, আমি তোমাদের আল্লাহর হাত থেকে বাঁচাতে পারব না।’ ধীরে ধীরে রোগযন্ত্রণা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিন তিনি হজরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে কিছু স্বর্ণমুদ্রা জমা রেখেছিলেন। তিনি তীব্র রোগযন্ত্রণার মধ্যেও বলেন, ‘আয়েশা! সেই স্বর্ণমুদ্রাগুলো কোথায়, যা আমি তোমার কাছে জমা রেখেছিলাম? আমি কি আল্লাহর সঙ্গে এ অবস্থায় মিলিত হব যে আমার ঘরে স্বর্ণমুদ্রা। এগুলো বিতরণ করে দাও।’ রোগযন্ত্রণা কখনো বৃদ্ধি পাচ্ছিল আবার কখনো হ্রাস পাচ্ছিল। ওফাতের দিন সোমবার তিনি অনেকটা সুস্থ ছিলেন। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, তিনি তত ঘন ঘন বেহুঁশ হতে থাকেন। এ অবস্থায় তাঁর পবিত্র জবানে উচ্চারিত হতে থাকে—তাঁদের দলভুক্ত করুন, আল্লাহ যাঁদের প্রতি অনুকম্পা করেছেন। কখনো বলতে থাকেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি মহান বন্ধু!’ আবার কখনো বলতে থাকেন, এখন আর কেউ নেই, তিনিই মহান বন্ধু। এ কথাটি তিনবার উচ্চারণ করেন। তখন তাঁর পবিত্র আত্মা প্রিয় বন্ধু আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যায়।

ওফাতের সময় ছিল ১১ হিজরি, মাসটি ছিল রবিউল আউয়াল, আর তারিখ ছিল ১২, দিনটি ছিল সোমবার, সময় ছিল চাশত নামাজের শেষ, বয়স ছিল ৬৩, ওফাতের স্থান হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরা—তাঁর কোল। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার প্রতি আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত হলো, আমার কোলে রাসুল (সা.) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তাঁর মুখের লালার সঙ্গে আমার মুখের লালা একত্রিত হয়েছে।’ ঘটনাটি হলো, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রাসুল (সা.)-এর কাছে একটি মিছওয়াক হাতে নিয়ে এসেছিলেন, রাসুল (সা.) বারবার মিছওয়াকের দিকে তাকাতে দেখে হজরত আয়েশা বলেন, ‘আপনি কি মিছওয়াক করবেন?’ তখন তিনি মাথা মোবারক নেড়ে সম্মতি জানালে হজরত আয়েশা (রা.) একটি মিছওয়াক নিয়ে মুখে চিবিয়ে নরম করে রাসুল (সা.)-কে দেন। তিনি সেই মিছওয়াক দিয়ে মিছওয়াক করেন। আরো নেয়ামত হলো, তাঁর হুজরায় রাসুল (সা.) সমাহিত হন, তাঁর পবিত্রতায় কোরআনের আয়াত নাজিল হয় এবং তিনিই রাসুল (সা.)-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী।

ওফাত বিলম্বিত হওয়ার কারণ : মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেছেন সোমবার চাশতের শেষ সময়। মঙ্গলবার তাঁকে গোসল দেওয়া হয়। গোসল দিয়েছেন হজরত আব্বাস (রা.), হজরত আলী (রা.), হজরত আব্বাস (রা.)-এর দুই ছেলে ফজল ও সাকাম, রাসুল (সা.)-এর আজাদকৃত ক্রীতদাস সাকরাম, ওসামা বিন যায়েদ ও আউস ইবনে খাওলা (রা.)। গোসলের পর বিশ্বনবী (সা.)-কে তিনটি ইয়েমেনি সাদা কাপড়ে কাফন পরানো হয়, অতঃপর ১০ জন ১০ জন করে সাহাবায়ে কেরাম হুজরায় প্রবেশ করে পর্যায়ক্রমে জানাজার নামাজ আদায় করেন। নামাজে কেউ ইমাম ছিলেন না। সর্বপ্রথম বনু হাশিম গোত্রের সাহাবিরা, তারপর মুহাজির, অতঃপর আনসার, তারপর অন্যান্য পুরুষ সাহাবি, অতঃপর মহিলা ও সর্বশেষে শিশুরা জানাজার নামাজ পড়ে। জানাজার নামাজ পড়তে পড়তে মঙ্গলবার সারা দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে সাইয়্যেদুল আম্বিয়া আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-কে হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় দাফন করা হয়।

মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মৃতদের দাফন দ্রুত সম্পন্ন করো, বিলম্ব কোরো না।’ (বুখারি, হাদিস ১৩১৫) তার পরও মহানবী (সা.)-এর জানাজা ও দাফন বিলম্বিত হয়েছে। এর কারণ প্রধানত তিনটি।

১. তাঁর ওফাতের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছতে বিলম্বিত হওয়া : মহানবী (সা.)-এর ওফাতের খবর শুনে হজরত ওমর (রা.) জ্ঞানহারা হয়ে যান, তিনি দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, কিছু কিছু মুনাফিক মনে করে যে রাসুল (সা.) ইন্তেকাল করেছেন, আসলে তিনি ইন্তেকাল করেননি। তিনি হজরত মুসা (আ.)-এর মতো সেই প্রভুর কাছে গেছেন, আবার ফিরে আসবেন। আল্লাহর শপথ—‘যারা বলে, মুহাম্মদ (সা.) ইন্তেকাল করেছেন, আমি তাদের হাত-পা কেটে ফেলব।’ হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) রাসুল (সা.)-এর ওফাতের সময় নিজ বাড়িতে ছিলেন, খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে আসেন। তিনি ওমর (রা.)-কে শান্ত করার জন্য বসতে বললে ওমর (রা.) না বসেই আরো উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তখন আবু বকর সিদ্দিক (রা.) উপস্থিত সব সাহাবির সামনে সুরা আলে ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান। তখন সবাই শান্ত হয় এবং সবাই বুঝতে পারে যে আসলেই রাসুল (সা.) ইন্তেকাল করেছেন। হজরত ওমর (রা.) বলেন, ‘হজরত আবু বকর (রা.)-এর মুখে মুহাম্মদ (সা.) শুধু রাসুল মাত্র, তাঁর আগেও বহু রাসুল গত হয়ে গেছেন… শ্রবণ করার পর মাটিতে ঢলে পড়েছিলাম এবং স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম যে রাসুল সত্যি ইন্তেকাল করেছেন।’ অতঃপর সবাই ওফাতের ব্যাপারে একমত হওয়ার পর দাফনকাজ সম্পন্ন করা হয়।

২। দাফনের স্থান নির্দিষ্ট না থাকা : মহানবী (সা.)-কে কোথায় দাফন করা হবে, তা সাহাবায়ে কেরামের জানা ছিল না। ফলে তাঁদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। কেউ কেউ বলেন, জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হোক, কেউ কেউ বলেন, মসজিদ-ই-নববীতে দাফন করা হোক, আবার কেউ কেউ প্রস্তাব করেন হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর পাশে সমাহিত করা হোক। এমতাবস্থায় হজরত আবু বকর (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, নবী যেখানেই মৃত্যুবরণ করেন সেখানেই সমাহিত হন।’ অতঃপর হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় যেখানে রাসুল (সা.) ইন্তেকাল করেন, সেখানে সমাহিত করার ব্যাপারে একমত হন।

৩। খলিফা নির্বাচনে ঐকমত্যে পৌঁছতে বিলম্ব : মহানবী (সা.)-এর স্থানে কে রাষ্ট্রের খলিফা হবেন, এ নিয়ে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল। পরবর্তী সময় হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ব্যাপারে সবাই ঐকমত্যে পৌঁছলে মহানবী (সা.)-এর দাফনের কাজ সম্পন্ন করা হয়।

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।

মিথ্যা ঈমানের পরিপন্থি

>>> মিথ্যা ঈমানের পরিপন্থী <<<
আবু বাকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন;
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، إِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكَذِبَ مُجَانِبٌ لِلْإِيمَانِ
হে লোকসকল! তোমরা মিথ্যা বলা থেকে বেচেঁ থাক। কেননা, মিথ্যা ঈমান দুর করে দেয়। (মুসনাদে আহমাদ: ১৬)
আবু বাকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন;
وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّهُ مَعَ الْفُجُورِ، وَهُمَا فِي النَّارِ
তোমরা মিথ্যা বলা থেকে বেচেঁ থাক। কেননা, মিথ্যা পাপাচারের অন্তর্ভুক্ত। এই দুটোই জাহান্নামে যাওয়ার উপকরণ। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮৪৯; মুসনাদে আহমাদ, ১/৫, ১৭)

সন্তানকে ইসলামী শিক্ষাবঞ্চিত রাখলে অভিভাবক দায়ী

সন্তানাদি মহান স্রষ্টা আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে আমানত। এ আমানতকে রক্ষা করতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে এমন আচরণই করতে হবে, যা তার শারীরিক প্রবৃদ্ধির জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সহায়ক। তাদের এমন শিক্ষাই দিতে হবে, যা তাদের মনন ও মানস গঠনে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে।

মানবজন্মের উদ্দেশ্যই হলো মহান স্রষ্টা আল্লাহকে পরিচয় করা। আজকে যারা শিশু, তারা একদিন বড় হবে, তাদের ওপর আল্লাহর বিধান মানার দায়িত্ব অর্পিত হবে। কোনো নিয়ম বা বিধান না জানলে মানা যায় না। তাই সন্তানদের এমন শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে আল্লাহর বিধান মেনে সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর সহজে চলতে পারে। জেনে-বুঝে চলতে পারে, সহি-শুদ্ধভাবে আমল করতে পারে। তার না জানার দায় যেন তার পিতামাতা বা অন্য কারো ওপর চাপিয়ে দিতে না পারে। পিতামাতাকে দায়িত্বসচেতন থাকতে হবে। কারণ, সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলার দায়িত্ব পিতামাতার বা অভিভাবকের। এজন্যে সন্তানকে ইসলামী-শিক্ষা অবশ্যই দিতে হবে। সেই সঙ্গে সন্তানাদির উন্নত চরিত্রগঠন, ভদ্রতা, শিষ্টাচার এবং ব্যবহারিক জীবনে আমলের অভ্যাস তৈরি করতে দীক্ষাও দিতে হবে। মহানবী সা. ইরশাদ করেন- “কারো তার সন্তানকে আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দান করা একসা’ (একটি পরিমাপ) শস্য আল্লাহর রাস্তায় সদকা করা থেকেও উত্তম।” (তিরমিযি শরীফ) নবীজি সা. আরো ইরশাদ করেন- “কোনো পিতা তার সন্তানকে ভালো আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া থেকে উত্তম কোনো পুরস্কার দিতে পারে না।” (তিরমিযি শরীফ) নবীজি সা. আরো ইরশাদ করেন- “তোমরা নিজ সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে নামাযের নির্দেশ দান করো, দশ বছর বয়সে নামায না পড়লে শাস্তি দান করো এবং ঘুমানোর সময় তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।” (আবু দাউদ শরীফ)

মানবতার মহান শিক্ষক নবী কারীম সা. সন্তান জন্মের বহু আগ থেকেই ভালো ও নেক সন্তান কিভাবে জন্ম নেবে, কিভাবে তাদের প্রতিপালন করতে হবে, কিভাবে শিক্ষার পাশাপাশি দীক্ষাও দিতে হবে- এ ব্যাপারে মূল্যবান নির্দেশনা দান করেছেন।

প্রথম নির্দেশনা : সন্তান লাভ করার নিমিত্তে মানুষ যে বিয়ে করে, সে যেন দ্বীনদার ভালো মেয়েকে বিয়ে করে, কোনো বদদ্বীন, দুশ্চরিত্র মেয়েকে যেন বিয়ে না করে। ভদ্র, চরিত্রবান ও দ্বীনদার মেয়েকে যেন পাত্রী হিসেবে নির্বাচন করে। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- “হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন- চারটি বৈশিষ্ট্যের মধ্য থেকে কোনো একটি বৈশিষ্ট্য দেখে মহিলাকে বিয়ে করা হয়। মহিলার ধন-সম্পদ দেখে, তার বংশমর্যাদা দেখে, তার রূপ দেখে কিংবা তার দ্বীনদারি দেখে। তুমি মহিলাকে তার দ্বীনদারি দেখে বিয়ে করো, জীবনে সুখী হতে পারবে।” (মিশকাত শরীফ)

এভাবে মেয়ের পিতামাতা তথা অভিভাবককে বলা হয়েছে, কোনো ফাসিক ফাজির ও দুশ্চরিত্র লোকের কাছে তোমার মেয়েকে বিবাহ দেবে না। বরং দ্বীনদার ও মোত্তাকি পরহেজগার লোকের নিকট বিয়ে দেবে। এমন লোকের কাছ থেকে প্রস্তাব এলে কোনো দ্বিধা না করে সাদরে সে প্রস্তাব গ্রহণ করবে। নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন- “এমন লোকের পক্ষ থেকে যদি তোমার মেয়ে বিয়ের প্রস্তাব আসে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্রকে তুমি পছন্দ করো, তাহলে তার কাছে বিয়ে দিয়ে দাও। এটা যদি না করো, তাহলে জমিনে ফেতনা ও নানা বিপর্যয় দেখা দেবে।” (মিশকাত শরীফ)

নবীজির এসব নির্দেশনা ওপর আমল করে পিতামাতা দ্বীনদারি অবলম্বন করলে তাদের ঔরসে নেককার সন্তানাদি জন্ম নেবে।

দ্বিতীয় নির্দেশনা : মিলিত হওয়ার সময় ইসলামী বিধি মানতে হবে। একেবারে বিবস্ত্র হওয়া যাবে না। লজ্জাস্থানের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাবে না। মিলিত হওয়ার পূর্বে নির্ধারিত দোয়া পড়তে হবে। দোয়াটি না জানলে কোনো আলিমের নিকট থেকে শিখে নিতে হবে।

তৃতীয় নির্দেশনা : সন্তান জন্মলাভ করার পর শরীর পরিচ্ছন্ন করে তার ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামাত দিতে হবে। আযানে প্রথমে চারবার “আল্লাহু আকবার” বলে বাচ্চার মন-মস্তিষ্কে এ কথা বসিয়ে দিতে হবে, দুনিয়াতে কারো শক্তি আল্লাহর শক্তি থেকে বেশি নয়। আল্লাহই সবচে’ বড় শক্তিশালী, মহাপরাক্রান্ত এবং মাপ্রতাপান্বিত। তিনি বিদ্যমান। সদা সর্বদা ছিলেন, আছেন ও থাকবেন। তারপর দু’বার “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলে আল্লাহর একত্ববাদের বাণী কানে পৌঁছিয়ে তার অবচেতন মনের কাছে এ দাবি রাখা হবে, আল্লাহর একত্ববাদের প্রচার-প্রসারে কারো ভয়ে ভীত হওয়া যাবে না। অতঃপর দু’বার “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” বলার মাধ্যমে এমন পবিত্র ব্যক্তিত্বের রিসালাতের ঘোষণা দান করতে হবে, যার মাধ্যমে আমরা কুফুর ও শিরকের অন্ধকার থেকে বের হয়ে তাওহীদ ও ঈমানের আলোর ময়দানে পদার্পণ করেছি। আল্লাহর অস্তিত্ব, তার একত্ববাদ এবং নবীজির রিসালাত ঘোষণার পর দু’বার “হাইয়্যা আলাস সালাহ” বলে ইসলামের সবচে’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাযের দাওয়াত দেয়া হবে। দু’বার “হাইয়্যা আলাল ফালাহ” বলে চিরস্থায়ী সফলতা যে নামাযের মধ্যেই নিহিত আছে, সেই নামাযের প্রতি পুনর্বার আহ্বান ব্যক্ত করা হবে। সবশেষে দু’বার”আল্লাহু আকবার” এবং একবার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর মাধ্যমে এ কথা বলা হবে, মুসলমানের জীবনে সফলতা আর কামিয়াবি তখনই আসবে, যদি জীবনের সূচনায় তাওহীদ অন্তরে বদ্ধমূল হয় এবং তাওহীদি বিশ্বাস নিয়ে নেক আমলের ওপর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

চতুর্থ নির্দেশনা : কোনো বুযুর্গ আলেমকে দিয়ে তাহনিক করাবে। তাহনিক হলো- বাচ্চাকে কোনো বুযুর্গ আলেমের নিকট নিয়ে যাবে। তিনি বরকতের জন্য দোয়া করবেন এবং খেজুর চিবিয়ে নরম করে বাচ্চার মুখের তালুতে লাগিয়ে দেবেন, যাতে বাচ্চা চেটে চেটে নিঃশেষে খেয়ে নেয়। এভাবে সাহাবায়ে কেরামও নবীজিকে দিয়ে তাদের নবজাতকদের তাহনিক করাতেন এবং বরকতের জন্য দোয়া করাতেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন- “নবীজির কাছে বাচ্চাদের নিয়ে আসা হতো। তিনি তাদের বরকতের জন্য দোয়া করতেন এবং তাদেরকে তাহনীক করতেন। অর্থাৎ- খেজুর চিবিয়ে তাদের মুখের তালুতে লাগিয়ে দিতেন।” (মিশকাত শরীফ)

পঞ্চম নির্দেশনা : নবীজি সা. ইরশাদ করেন- “যার ঘরে বাচ্চা জন্মলাভ করবে, সে যেন বাচ্চার সুন্দর নাম রাখে এবং তাকে আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়।” (মিশকাত শরীফ) বাচ্চার জন্য অর্থপূর্ণ ভালো নাম রাখতে হবে। যাতে এ নামে বাচ্চার বরকত হয় এবং তার কামিয়াবির কারণ হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- “আল্লাহ নিকট সবচে’ পছন্দনীয় নাম হলো আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান।” অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- “তোমরা আম্বিয়ায়ে কেরামের নামে তোমাদের বাচ্চাদের নাম রাখো।”

ষষ্ঠ নির্দেশনা : বাচ্চার যখন মুখ ফুটবে, কথা বলতে শিখবে, তখন তাকে কালেমার তালিম দিবে। ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ ভালো সচ্চরিত্রবান শিক্ষকের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা দান করবে। সময় মত ধর্মীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি করাবে। যত্নসহকারে প্রয়োজনীয় ইসলামিশিক্ষা দান করবে। সে মোতাবেক আমল করে কি-না, খেয়াল রাখবে। আমল সুন্দর করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করবে, প্রয়োজনে চাপ সৃষ্টি করবে।

প্রয়োজনীয় ইসলামী শিক্ষা দান করার পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষাও দান করবে। দুনিয়ার লাইনে যত বড় শিক্ষিতই হোক, কোনো অসুবিধে নেই। বরং এটাও কাম্য। তবে ধর্মীয় শিক্ষা আরো বেশি কাঙ্ক্ষিত, এটাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষা- এটা কল্যাণকর। আর ধর্মীয়শিক্ষা বিবর্জিত জাগতিক শিক্ষা- সকল অকল্যাণ ও পাপাচারের প্রতিভূ। সন্তানকে জাগতিক শিক্ষা দেবার জন্য অর্থ-বিত্ত খরচ করলেন, ইসলামি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখলেন- এটা সন্তানের জন্য কল্যাণকামিতা নয়। এটা বাচ্চার সঙ্গে দুশমনি, নিজের সঙ্গেও দুশমনি। এর জন্য আল্লাহর দরবারে জবাবদেহি করতে হবে। দোষী সাব্যস্ত হতে হবে। মহনবী সা. ইরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ভালোবেসে অগ্রাধিকার দেয়, সে আখেরাতের ক্ষতি করে। আর যে ব্যক্তি আখেরাতকে ভালোবেসে অগ্রাধিকার দেয়, সে তার দুনিয়ার ক্ষতি করে। সুতরাং ক্ষণস্থায়ী জিনিসের ওপর চিরস্থায়ী জিনিসকে অগ্রাধিকার দাও।” (রাওয়াহু আহমদ) কোনো তত্ত্বজ্ঞানী বলেছেন- “মানুষের বন্ধু এবং কল্যাণকামী হলো সেই ব্যক্তি, যে তার আখেরাতকে সুন্দর ও শান্তিময় করার চেষ্টা করে; যদিও এতে তার দুনিয়ার কিছু ক্ষতি হয়ে যায়। আর মানুষের শত্রু হলো সেই ব্যক্তি, যে তার আখেরাতের ক্ষতি করার চেষ্টা করে; যদিও এতে তার দুনিয়ার কিছু ফায়েদা হয়ে যায়।” (মাজালিসুল আবরার)

পিতামাতা যদি সত্যিই সন্তানের কল্যাণকামী হয়ে থাকেন, অবশ্যই সন্তানের ইসলামি শিক্ষাদানকে অগ্রাধিকার দান করবেন। কারণ, এতে আখেরাতে নিজেরাও বাঁচবেন, সন্তানাদিও বাঁচবে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- “দোজখের আগুন থেকে তোমরা নিজেরাও বাঁচো এবং তোমাদের পরিবারবর্গকেও বাঁচাও।” (সূরা তাহরীম, আয়াত-৭)

স্মরণ রাখতে হবে, সন্তান বিগড়ে গিয়ে বদদ্বীন হওয়ার সমস্ত জিম্মাদারি পিতামাতা এবং অভিভাবকের ওপর বর্তাবে। সন্তানকে যে রকম শিক্ষা-দীক্ষা দেয়া হবে, সে সেভাবেই গড়ে ওঠবে। নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন- “প্রতিটি সন্তানই ফিতরাত তথা ইসলাম গ্রহণ করার পূর্ণ যোগ্যতা নিয়ে জন্মলাভ করে। কিন্তু তার পিতামাতা শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানায়।” (মিশকাত শরীফ) বর্ণিত হাদীস দ্বারা বুঝা যায়- সন্তানের মন-মানস, চরিত্র-অভ্যাস, লাইফস্টাইল ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি পিতামাতা প্রদত্ত শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারা প্রভাবিত হয়। পিতামাতা যেভাবে প্রতিপালন করবেন- যে ধরনের শিক্ষা-দীক্ষা দান করবেন, সন্তান সেভাবেই বেড়ে ওঠবে। কিয়ামত দিবসে পিতাকে তার সন্তানাদি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে- “তুমি সন্তানকে কী শিক্ষা দিয়েছিলে এবং কী ধরনের ভদ্রতা ও শিষ্টাচার শিখিয়েছিলে?”

সন্তানের শারীরিক প্রতিপালনের পর সবচে’ বড় কর্তব্য হলো, সন্তানকে এমন যোগ্য করে গড়ে তোলা- যাতে সে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হয় এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারে। তাকে এমন শিক্ষা-দীক্ষা দান করা- যাতে সে নবীজির আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। নামায-রোযা ইত্যাদির পাবন্দি করে। যাতে তার মনে আখেরাতের ফিকির পয়দা হয়। কোনো অবস্থায়ই ইসলামিশিক্ষাকে অবজ্ঞা করা চলবে না। যথাযত গুরুত্বসহকারে ইসলামিশিক্ষা দিতে হবে। সহি-শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত শেখাতে হবে। কারণ, হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- “প্রয়োজন পরিমাণ দ্বীনী ইলিম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরয।” (ইবনে মাজাহ) কোনোরকমে নাজেরা কোরআন পড়িয়ে দিলেই কিংবা “তালিমুল ইসলাম” জাতীয় ছোট কোনো কিতাব পড়িয়ে দিলেই দ্বীনীশিক্ষা অর্জন করার ফারযিয়্যাত আদায় হবে না। বরং বালেগ হওয়া থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে যা যা আমল করতে হবে, যে যে বিশ্বাস পোষণ করতে হবে এবং যা যা পরিহার করে চলতে হবে- এসব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে যে পরিমাণ ইলমের প্রয়োজন, তা অর্জন করা ফরয।

পিতামাতা, অভিভাবক বা রাষ্ট্র যদি নব প্রজন্মকে ইসলামিশিক্ষা থেকে মূর্খ রাখেন, নামায-রোযা ইত্যাদি আমল-বন্দেগিতে অভ্যস্ত করে গড়ে না তোলেন, ইসলামী আদর্শ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করার অভ্যাসি না বানান এবং জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে না দেন- তাহলে কিয়ামত দিবসে এ নব প্রজন্মই তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে বিচার দায়ের করবে। তখন কী হবে? জীবন ও জগতের স্বার্থে, আমাদের স্বার্থে এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা উচিৎ। আল্লাহ সকলকে বুঝবার তাওফিক দান করুন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর, বিয়ানীবাজার, সিলেট

‘আল্লাহ’ লেখা গোশতের টুকরা কি খাওয়া যাবে?

প্রশ্ন : আসসালামু আলাইকুম, সম্মানিত মুফতি সাহেব, আপনার কাছে আমার জানার বিষয় হলো, কয়েকদিন আগে আমরা একটি গরু জবাই করি, গরুর গোস্ত কাটার সময় হঠাৎ করে একটি গোস্তের টুকরার মাঝে পরিস্কারভাবে “আল্লাহ” লেখা দেখতে পাই। উক্ত টুকরাটি আমরা আলাদা করে রেখে দেই। আমার প্রশ্ন হলো, উক্ত গোস্তের টুকরাটি আমরা কী করব? খেতে পারব কি?

এমন আরো অনেকের মুখেই শুনেছি, আলুসহ অন্যান্য খাবার বস্তুর মাঝেও এমন আল্লাহ লেখা পাওয়া যায়। এখন বস্তুগুলো খাওয়া যাবে কি? নাকি কোনো পবিত্র স্থানে সংরক্ষিত করে রাখতে হবে? দয়া করে জানালে কৃতজ্ঞ হবো।

উত্তর :

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم

উক্ত গোস্ত বা আলু ইত্যাদি খাওয়াতে কোনো সমস্যা নেই। বরং বরকতের নিয়তে খুশি মনেই খাওয়া উচিত। [ফাতাওয়া কাসিমীয়া : ২৪/৭৬]

أَبُو عَبْدِ الله السُّلَمِيُّ: ” فِي ذِكْرِ مَنْصُورِ بْنِ عَمَّارٍ وَأَنَّهُ أُوتِيَ الْحِكْمَةَ، وَقِيلَ: إِنَّ سَبَبَ ذَلِكَ أَنَّهُ وَجَدَ رُقْعَةً فِي الطَّرِيقِ مَكْتُوبًا عَلَيْهَا بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ فَأَخَذَهَا فَلَمْ يَجِدْ لَهَا مَوْضِعًا فَأَكَلَهَا فَأُرِيَ فِيمَا يَرَى النَّائِمُ قَائِلًا يَقُولُ لَهُ: قَدْ فَتَحَ اللهُ عَلَيْكَ بَابُ الْحِكْمَةِ بِاحْتِرَامِكَ لِتِلْكَ الرُّقْعَةِ، وَكَانَ بَعْدَ ذَلِكَ يَتَكَلَّمُ بِالْحِكْمَةِ (شعب الإيمان للبيهقى، فصل فى تعظيم المصحف، دار الكتب العلمية بيروت-2/545/ رقم-2662، مكتبة الرشد للنشر، رقم- 2416)

উত্তর দিয়েছেন : লুৎফুর রহমান ফরায়েজী